কূটকচালি ।। সনাতন বিশ্বাস উবাচ


রঙের হায়া,ধর্ম ও শরম


      অঘ্রাণের তাপমাত্রা যেন পেট্রোলের দামের ন্যায় হইয়াছিল। পেট্রোলের দাম যেমন একদিন ২৭ পয়সা কমিয়া দুই দিন পর ৩২ পয়সা বাড়িয়া যায়, তেমনি আমরা জুবুথুবু শীতের প্রত্যাশায় বসিয়া থাকিলেও, ব্যারোমিটারের পারদ হু হু করিয়া নিম্নগামী হইবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছিল না। একটি দশ ফুট দৈর্ঘ্যের  তৈলাক্ত বাঁশে, একটি বাঁদরকে উঠিতে বলায় সে ৩ ফুট উঠিয়া, এক ফুট নামিলে সে কয় ফুট উঠিবে,-- এবম্প্রকারের জটিল অঙ্কটি স্মরণে আসিল। অবশেষে আকাশের দেবতা প্রসন্ন হইয়াছেন। বিগত কয়েকদিন যাবৎ , বাতাসে হিমের পরশ অনুভূত হইতেছে। কিন্তু তাহা কতদিন স্থায়ী  হইবে, তাহা একদার আয়ারাম গয়ারাম সরকারের ন্যায় বলিয়াই শঙ্কা হইতেছে। পাঠক, স্মরণ করুন, চৌধুরী চরণ সিং-ও প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে আরোহণ করিয়া, স্বল্প কালের মধ্যে অবরোহন করিতে হইয়াছিল। যাহা হউক, আদার ব্যাপারী হইয়া, রাজনীতির জাহাজের গল্প ফাঁদিতে বসিলে, তাহা অপরে শুনিবে কেন ? আমারা সাধারণ লোক ; প্রতিবেশীর সাতে-পাঁচেও থাকিনা । অতএব রাজনীতির মহাজনদের লইয়া, আমরা কী করিব ! তাঁহারা ভোটের যন্ত্র হইতে নির্গত হইয়া দিল্লী-দিসপুর আলোকিত করিলেই আমরা কৃতার্থ হই । রাজনীতি আমাদের বিষয় নহে, বিষবৎ পরিত্যাজ্য।  পাঠক, আমরা লক্ষ্মীর ন্যায় চঞ্চলা হইয়াছে যে শীত, তাহাকে লইয়া আলোচনায় রত ছিলাম। শীতের রৌদ্রে পিঠ পাতিয়া দিয়া, খোসা ছাড়াইয়া কমলালেবু ভক্ষণের অবসরবিলাস এখন আর নাই। কে লিখিয়াছিলেন, বিলাস অন্যত্রে ? তিনি যে-অর্থেই 'বিলাস' লিখিয়া থাকুন, তিনি ভবিষ্যতদ্রষ্টা ; বিলাস সত্যই আমাদের জীবনে নাই। কারণ, আমাদের অবসর নাই। অবসর না থাকিলে, তাহার চিত্তে বিলাসিতা করিবার, স্ফূর্তির অবকাশ থাকে না। সে নিত্যদিনের অতি ক্ষুদ্র, আপাত তুচ্ছ বিষয়কে গুরুভার করিয়া, আপন স্কন্ধকে এমন ভারাক্রান্ত করিয়াছে, যে মাথা তুলিয়া আকাশ, বৃক্ষরাজির শাখে তাকাইতে ভুলিয়া গিয়াছে। সে যে কীসের সন্ধানে, অহোরাত্র ছুটিতেছে, তাহা নিজেও জ্ঞাত নয়। আমরা তাহার দুর্ভাগ্যকে নিন্দা করিব না, করুণাও করিব না। বরং আমরা দেখিব, উদ্যানকে কী  কী পুষ্প আলোকিত করিতেছে, দেখিব অস্তগামী সূর্যালোক কী করিয়া মেঘপুঞ্জকে রঞ্জিত করিতেছে, দেখিব মন্দ্র মন্থর সন্ধ্যায় পাখীরা ফিরিতেছে কুলায়। 

       আমার এই সকল ভাবনা,--যাহা হয়তো আসন্ন বার্ধক্যজনিত  স্থবিরতারই পূর্বলক্ষণ,--তাহাতে ছেদ পড়িল। সনাতন আসিয়াছে। তাহার আগমন নিয়মিত রূপে, অনিয়মিত হইতেছে। এইমর্মে গৃহকত্রী কালবিলম্ব না করিয়া অনুযোগ করিলেন। তিনি সনাতনের ভোজনপ্রিয়তা স্মরণে রাখিয়া নানা প্রকার সুস্বাদু মিষ্ট পদ প্রস্তুত করিয়া রাখেন। কিন্তু সনাতনের অনুপস্থিতিতে সেই সকল পদ রাম ও শ্যামের উদরে বাহিত হয়। অদ্য সনাতন সম্যক উত্তেজিত। সে   একটি হিন্দি সিনেমাকে কেন্দ্র করিয়া যে তুফান উঠিয়াছে, তাহাতে বিরক্ত। সনাতনের চিরাচরিত  বলিউড সিনেমাপ্রীতি কদাপি ছিল না।  তাহার উত্তেজনার কারণটি অবহিত করিবার পূর্বে, সনাতন সম্পর্কে দুই চারিটি কথা, যাহা বলিব বলিব করিয়া বলা হয় নাই, তাহা  ইত্যবকাশে  বলিয়া রাখি। সনাতন নামটি তাহার পিতৃদত্ত নাম নহে ; ইহা তাহার স্বোপার্জিত না হইলেও, স্বনির্বাচিত নাম তো বটেই। মহৎ লেখকেরা আপন নাম পরিহার করিয়া, বিবিধ নাম, আপন রুচি অনুযায়ী লইয়া থাকেন। হুতোমপ্যাঁচা, ভানু সিংহ, পরশুরাম, বনফুল, সনাতন পাঠক, নীললোহিত, কালকূট,-- আদি বহুপ্রকার নাম বঙ্গ সাহিত্যিকে আলোকিত করিয়াছে। আমাদের সনাতন তেমন সৃজনশীল সাহিত্যে যুক্ত না থাকিলেও, সনাতন বিশ্বাস নাম গ্রহণের একটি কার্যকারণ আছে বলিয়া শুনিয়াছিলাম। দেশে সনাতন বিশ্বাসের প্রাবল্য উপলব্ধি করিয়া এবং  দেশের বিভিন্ন স্থানে, সনাতন বিশ্বাসীদের ভাবানুবেগ আক্রান্ত হইতেছে দেখিয়া, সে স্থির করিল, যে সে 'সনাতন বিশ্বাস নামটি গ্রহণ করিয়াছিল।

        উষ্ণ সুরভিত চা ও ফুলকপির পাকোড়া আসিল। গৃহকত্রী আঁচলে হাত মুছিয়া বসিলেন। সনাতন গৃহকত্রীর দিকে নিস্পলকে চাহিয়া রহিল। তিনিও কিঞ্চিৎ বিস্মিত হইলেন। সনাতনই বিস্ময়ের অবসান ঘটাইয়া কহিল,-'বৌদি , আপনি এই কী শাড়ি পরিয়াছেন'? আমরা পরস্পরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলাম। সনাতন কহিল,– 'আপনার শাড়িতে গৈরিক বর্ণের  পুষ্প অংকিত; পাড়টিও গৈরিক বর্ণের, যাহা আপনার পদযুগল স্পর্শ করিতেছে। এই বর্ণটি অতি পবিত্র । এই বর্ণের বস্ত্র  সন্তরা পরিধান করেন। আপনি এই শাড়ি পরিয়া বিপদে পড়িতে পারেন'। শুনিয়া গৃহকত্রী  অট্টহাস্য করিলেন। ইহাতে সনাতন বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,–' বৌদি কি সংবাদপত্র পাঠ করেন না ? পড়িলে জানিতেন, সম্প্রতি গৈরিক বর্ণের পোষাক পরিধান করিয়া দীপিকা পাড়ুকোন, কী বিড়ম্বনায় পড়িয়াছেন'। আমিও সংবাদটি পড়িয়াছি। 

      সনাতন কহিল যে সিনেমাটি লইয়া যাহা চলিতেছে, তাহাতে দেশটি যেন মধ্যযুগে ফিরিয়া  যাইতেছে । আমি কহিলাম,–'দেশ তো অগ্রগতির দিকে যাইতেছে।  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দৌলতে দেশের অর্থনীতি ছুটিতেছে। দেশের শিল্পপতিরা বিশ্বের সেরাদের মধ্যে স্থান অধিকার করিতেছেন। ইহা তো মধ্যযুগের   লক্ষন নহে'। সনাতন হাসিল। আমার বক্তব্য  তাহার মনঃপুত হয় নাই। সে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়া একটি  সিগারেট ধরাইল এবং গৃহকত্রী তৎক্ষণাৎ বসিবার ঘর হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। তিনি ধূম্রপানকে অতি গর্হিত অপকর্ম মনে করেন এবং আমার সহিত কলহ করিতে হইলে, ইহাকেই অস্ত্র হিসাবে প্রয়োগ করিয়া কলহ- যুদ্ধের সূচনা করেন। যাহা হউক, সনাতন পায়ের উপর পা তুলিয়া হেলান দিয়া বসিল। দৃষ্টি ছাদের দিকে স্থাপন করিয়া কহিতে লাগিল এবং আমি নিবিষ্ট চিত্তে শুনিতে  লাগিলাম। সে যখন বলিতে শুরু করে, তখন তাহার বক্তব্যে কোনোপ্রকারের বাধাদান বরদাস্ত করে না। 

       দেশের উন্নতি হইতেছে বটে। কিন্তু ইহার ফল খাইতেছে  কাহারা ? ভাবিয়া দেখিয়াছেন কি? ডলু বাগানে চা গাছ উৎপাটিত করিয়া, শ্রমিকদিগকে উচ্ছেদ করিয়া, বিমানবন্দর হইলে লাভ কাহাদের হইবে? শিলচর হইতে কি দিবারাত্র বিমান চলাচল করিবে? বরং শিলচর হইতে নিয়মিত কয়েক খানা দ্রুতগামী দূরপাল্লার ট্রেন চালু করিলে, উপত্যকাবাসী অধিক লাভবান  হইত। বেকারত্বের জন্যই এই শিলচরে প্রায় চারি সহস্র টুকটুক ( ইহা একপ্রকার ব্যাটারী চালিত বাহন) ছুটিতেছে। ফুটপাথ জুড়িয়া কত লোক পসরা সাজাইয়া বসিয়া আছে। দুই পা হাঁটিলেই প্রসারিত হস্ত একজন করিয়া ভিখারী বসিয়া আছে। লক্ষ করিবেন, যাহাদের বিস্তর অর্থ আছে, তাহাদের গৃহেই লক্ষ্মী ধনবর্ষণ করিতেছেন। ইহারা বৃহৎ বানিয়া। আর যাহাদের নাই, তাহারা দ্রুত  দারিদ্র্য সীমার দিকে ছুটিতেছে। তথাপি এই  নিরন্ন মানুষের বাচ্চারা নীরব রহিয়াছে। কারণ, তাহারা নিশ্চিন্ত যে তাহাদের ধর্ম সুরক্ষিত । তাহাদের মনে ইহাই গাঁথিয়া দেওয়া হইতেছে, যেন সে বিস্মৃত না হয় যে সে হিন্দু । আর হিন্দুত্ব বিপন্ন হইলে, তাহার সর্বস্ব হারাইবে। অতঃপর, দিন কতকের ব্যবধানে নিত্যনতুন বিষয় লইয়া হিন্দুত্বের প্রসঙ্গটি  জনমানসে আলোড়িত করা হয়। বর্তমানে ইহা সিনেমার নায়িকার অঙ্গবাসের রূপে ধূম্র উদ্গীরণ করিতেছে। কেবলি দৃশ্যের জন্ম হইবে ।

07.12.2022

Comments

Popular posts from this blog

বিশেষজ্ঞ

কুট্টুস

আবছায়া (পর্ব নয়) / সৌমিত্র বৈশ্য