বিশেষজ্ঞ




             প্রথমে ভেবেছিলাম, শিরোনামটি দেব, ‘অথ বাত ঘটিত বাত-চিৎ’ ; পরে ভেবে দেখলাম, রচনার শিরে স্থিত  নামটিই উপযুক্ত হবে। কারণটা পরে বলছি। আগে এই রোমহর্ষক ঘটনাটি বলে নেই। তবে, সকল রোমহর্ষক ঘটনাই, যার জীবনে ঘটে, তার জন্য হর্ষবর্ধক নাও হতে পারে। অন্ততঃ এই ক্ষেত্রে তো মোটেও নয়। সক্কাল সক্কাল মোবাইলে,  ভবেশ-গিন্নীর সন্ত্রস্ত কণ্ঠের আহ্বানে, শশব্যাস্ত হয়ে ছুটলুম ভবেশ বাবুর গৃহে। গিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার চোখ তো কপাল টপকে, তালুতে উঠে গেল। আমি উৎকন্ঠিত কণ্ঠে ভবেশ বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম,’আপনার নিজের শরীরের কোথাও কি জং ধরা লোহায় কেটেছিল ? ভবেশ বাবু ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘না’। বাঁশে কেটেছে ? কাঁচে কেটেছে ? পাক্কা গোয়েন্দার মত যত প্রশ্নই করি, সব কিছুরই একই উত্তর তিনি,-- গোয়েন্দা গল্পের পাকা অপরাধীর মত দিচ্ছেন, – ‘না’। তাঁকে প্রথম দর্শনে, আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল, তিনি হয়তো ধনুষ্টংকার রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কী রকম যেন অষ্টাবক্র মুনির চেহারা  (অষ্টাবক্র মুনিকে আমি দেখিনি। শুধু বিবরণ পড়েছি।) পরিগ্রহ করতে চলেছেন। ভবেশ-গিন্নীই তখন সবটা খোলসা করে বললেন। শুনে তো আমার যাকে বলে, আক্কেলগুড়ুম হবার যোগাড়। আসলে, ভবেশ বাবু কয়েকদিন থেকে কোমরের ব্যথায় ঈষৎ কাবু হচ্ছিলেন। উঠতে বসতে কষ্ট হতো। একদিন তাঁর সেজো মামা শ্বশুরের মেজো শালা এসেছিলেন তাঁদের বাড়িতে। তিনি সবটা শুনে, ভবেশ বাবুকে একটা আসন করতে বললেন। তিনি অবশ্য আসনটা নিজে করে দেখাননি। মুখে মুখে বলে যান। উপুড় হয়ে শুয়ে ডান পা উপরে তুলে, বাম হাত উপরে তুলতে হবে। এরপর, বাম পা আর ডান হাত। আর মাথা থাকবে যথাসম্ভব উপরে, ছাদের দিকে। এরকম দশ বার করতে হবে। তারপর ডান দিকে ও বাম দিকে কাত হয়ে একই রকম হাত পায়ের কসরত, তবে কোমরটাকে পেছন দিকে বাঁকাতে হবে। চিৎ হয়ে যা করার তো করে ফেললেন অক্লেশে। এবার কাত হতেই লাগল গোল। মাথা ও কোমরকে পারস্পরিক বিপরীতমুখী করতে গিয়েই, ঘাড় ও কোমরে যুগপৎ কট ও মট করে শব্দ হলো। এবং এরা একেবারে ক্রিকেটের ভাষায় কট বিহাইন্ড হয়ে গেছে। মানে, পিছন দিকে সেই যে বেঁকেছে, আর সোজা হচ্ছে না। ভবেশ-গিন্নী কোনোক্রমে চিৎ করে দিয়েছেন বটে। কিন্তু ভবেশ বাবুর দেহ  মাথা,কোমর ও মেরুদন্ড মিলিয়ে ধনুকের আকার নিয়েছে। খবরটা কী করে যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে পাড়া প্রতিবেশী ও পরে আশেপাশের গলি থেকে, লোকজন ভবেশ বাবুকে দর্শন করতে আসছে। উনি ঘাড় উর্ধমুখে বেঁকিয়ে, কোমর ও পা ইংরেজী ইউ অক্ষরের মত করে চিৎ হয়ে শুয়ে, এক দর্শনীয় মানবরূপ পরিগ্রহ করেছেন। সমবেত জনতার মধ্য থেকে নানা রকম পরামর্শ ছুটে আসছে। এর মধ্যে প্রাজ্ঞ এক ভদ্রলোক বললেন, ‘এসব যোগাসন অভিজ্ঞ যোগীদের কাছে শিখতে হয়’। শুনে কে যেন বলল,’আদিত্যনাথ বাবুকে ডেকে আনলে কেমন হয়?’। এরমধ্যে কেউ বলছে ডাক্তার নন্দীর কাছে নিয়ে যান। কেউ বলছে,এটা ফিজিওথ্যারাপিষ্টের কাজ। কেউ বলছে, ভারী সব তোষক বালিশ চাপা দিলেই সোজা হয়ে যাবেন। এরমধ্যে দয়াপরবশ হয়ে কেউ বোধহয় আদিত্যনাথ বাবুকে স্কুটারে চাপিয়ে নিয়ে এসেছে। তাঁকে দেখে একটু ভরসা পেলাম। ইনি যোগাচার্য আদিত্যনাথ শর্মা (রেজিস্টার্ড)। অন্ততঃ তাঁর বাড়ির সামনে সাইন বোর্ডে তাই লেখা আছে। তিনি সব শুনেটুনে গম্ভীর মুখে, ভবেশ গিন্নীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাল কি ইনি আমিষ খেয়েছিলেন?’ ভবেশ গিন্নী হ্যাঁ বলতেই, যোগাচার্য বললেন,’সেটাই কাল হয়েছে’। যা বুঝলাম, এখন যা করার, তা সুপ্রীম কোর্টের মত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদিত্যনাথ বাবুই করবেন। তিনি ভবেশ গিন্নীকে বললেন, ‘একটা কম্বল ও রুটি বেলনা নিয়ে আসুন’। অতঃপর, যোগাচার্য আদিত্যনাথ বাবু ভবেশ বাবুর উপর কম্বল বিছিয়ে, রুটি বেলনাকে রোড রলারের মত চালিয়ে দিলেন। এর আগে দুজনকে বলছিলেন ভবেশ বাবুর দুই হাত দুদিকে টেনে ধরতে। সেই টানেই কিনা জানিনা , ভবেশ বাবুর কণ্ঠ থেকে হ্রেষা ও বৃংহণ মিশ্রিত একটি অশ্রুতপূর্ব আওয়াজ নির্গত হল এবং তাঁর মাথাটি ধপাস করে বিছানায় পতিত হল। ঘরে একটা বিচিত্র গুঞ্জন উঠল। রুটি বেলনার অভিঘাতে ভবেশ বাবুর কোমরটিও সোজা হয়ে গেল। সমবেত সক্কলে যোগাচার্যকে ধন্য ধন্য করতে লাগল। শুধু বলে রাখি, এর পর ভবেশ বাবু যোগের সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখেননি। যোগকে জীবন থেকে একেবারেই বিয়োগ করে দিলেন। সেদিন নিরুর দোকানে চা খেতে খেতে ভবেন বাবু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘কবিগুরু কি যোগাসন করতেন ? সেদিন একটা গান বাজতে শুনলাম, ‘বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহারো সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো’।’ 

                       ভবেশ বাবুর সেজো মামা শ্বশুরের মেজো শালার মত সর্ব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আজকাল আমাদের চারপাশে গিজগিজ করছেন। সেদিন নিরু চা বানাবার সময় বলল, কে নাকি ওকে বলেছে, দোকানের পাশের নর্দমা থেকে গ্যাস জমিয়ে দিব্যি রান্নাবান্না করা যায়। অনেকটা সেই গোবর গ্যাসের মত। যে এই কথাটি বলেছে, সে নাকি বেশ কয়েক বছর থেকে এসব নিয়ে গবেষণা করছেন। এই তো কিছু দিন আগে ভবেশ-গিন্নী নাকি পাড়ার গিন্নীদের আসরে বলেছিলেন, তাঁর কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করে না। ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। শুনে একজন বললেন, নির্ঘাত লো প্রেসার। কেউ বললেন, ব্লাড সুগার। কেউ বললেন, থাইরয়েড। ভবেশ-গিন্নী বিভ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে সব বললেন। কর্তাকে সব বললেন। এবার এলো ডাক্তার দেখাবার পালা। এখানেও নানা জনের নানা মত। আর, কে না জানে, যত মত তত পথ। কেউ বলেন, রাম ডাক্তার। তো কেউ বলেন, শ্যাম ডাক্তার ভালো। কেউ বলেন, যদু ডাক্তার তরুণ। অনেক নতুন পদ্ধতি জানে। কারো মত, প্রবীণের অভিজ্ঞতার দাম আছে। শেষে পাড়ার ফার্মাসীর ছেলেটি বলল, ভিটামিন খাওয়ান। দেখুন দু’সপ্তাহ। তারপর মেডিসিনের কাউকে দেখিয়ে নেবেন। সে পনেরোটা ভিটামিন গুলি দিল। খেয়ে তো ভবেশ গিন্নী দিব্যি চাঙ্গা। ফার্মাসীর ছেলেটির কথায়, ভবেশ গিন্নী এখন রোজ একটা করে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাচ্ছেন। ভবেশ বাবুও খাচ্ছেন। বাতের ব্যথা আর নেই। 

                         আমি রক্তে শর্করা বৃদ্ধি হেতু কার যেন পরামর্শে রোজ একটা করে করলা সেদ্ধ খাই। এর মধ্যে কে আবার বলল, পাল্ং শাক খাবেন। ওতে লিভার ভালো থাকে। সেটাও শুরু করে দিলাম। মাঝে মাঝে গুগুল আমাকে নানা রকম খাদ্য বিষয়ক পরামর্শ দেয়। কারণ, এসব বিষয়ে আমি গুগুলকে প্রশ্ন করি। ইদানিং সে আমাকে রোজ কাশ্মীরী মামরা বাদাম খেতে বলছে। কিন্তু এর দাম মারাত্মক। ফলে, ওদিকে আর যাইনি। আমার এক অধ্যাপক বন্ধু নিয়মিত দুধের মধ্যে কেশর মিশিয়ে খায়। ওতে নাকি বল হয় দেহে। দেখবেন, আপনার চেনাজানার মধ্যে প্রচুর পুষ্টিবিদ ও খাদ্য বিশেষজ্ঞ আছেন। তাঁরা কোন মাছে হৃদপিন্ড ভালো থাকে, কোন ফল খেলে চোখ আপনার দূরবীন হয়ে যাবে,-- সব গড়গড় করে বলে যাবেন। আবার ধরুন, আপনার সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারেও তাঁদের কেউ কেউ ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ। আমার এক বন্ধু স্থানীয় ছোট ভাই তো মহা ফাঁপড়ে পড়ল। একজন তাকে বুঝিয়েছে, সায়েন্স পড়ে লাভ নেই। কমার্স পড়ুক। তারপর এম বি এ করবে। আরেকজন বলল, আরে না না। সায়েন্স পড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুক। তারপর এম বি এ করবে। যেন সবটাই হাতের মোয়া। ছেলে চায় আর্টস পড়তে। পাশের ফ্ল্যাটের মেসো মশাই তো হা হা করে উঠলেন। এত ভালো রেজাল্ট করে আর্টস পড়বে কী ! চাকরি নেই, চাকরি নেই ! 

                 আপনি যেদিকে যাবেন, সেদিকেই বিশেষজ্ঞ পাবেন। কাশ্মীরে সেই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে যাবার পর, ভবেশ বাবু জানালেন, এখন নাকি রাষ্ট্র বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের চাহিদা খুব বেশি। উনি আবার খবরের কাগজ খুব খুঁটিয়ে পড়েন। ইউটিউবে নানা রকম টি ভি চ্যানেলের খবর শোনেন এবং সেখানে যারা মন্তব্য করে , সেসবও বসে বসে পড়েন। তাছাড়া, কান পাতলেই বাজারে কত কথা শোনা যায়। বলতে ভুলে গেছি, ভবেশ বাবু এখন ফেসবুকও করেন। সেখানেই তিনি বহু টাটকা খবর পেয়ে যান। আমাদের তো মিলন মন্দির ওই নিরুর চায়ের দোকান। সেখানে বসে, গতকালই বলছিলেন, ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা তুলে দেবার দাবিতে জনমত খুব জোরালো হচ্ছে’। আমিও শুনেছি, কেউ নাকি বলেছে, সেক্যুলারদের উচিত দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। আমি বললাম, রক্ষে করেছে। আমি তো সেক্যুলারও নই, মাক্যুলারও নই। আমি একেবারেই পিকিউলিয়ার। এরমধ্যে কথায় কথা বাড়ার মত, প্রসঙ্গক্রমে উঠে এল, যুদ্ধ হবে কী না। নিরু আর নিরব থাকতে পারল না। সে এমনিতে কম কথা বলে। অধিকাংশ সময় নীরব থাকে। সেও বলে উঠল, ওদের আমরা চুন চুন কে মারেঙ্গে। এর সাজা হোগা। জরুর হোগা। উত্তেজনায় নিরু হিন্দি বলছে। আমার মনে হচ্ছিল, ও শোলে সিনেমার গব্বর সিং-এর সংলাপ বলছে। 

                     তবে, প্রসঙ্গ আরো এগোবার আগেই, ভবেন বাবু তাঁর সেই বিখ্যাত স্বগতোক্তি করে বসলেন, ‘দিনকাল ভালো নয়’। আমরা প্রসঙ্গ পাল্টে, পাউরুটি আর ঝোলাগুড় দিয়ে চিনি রহিত লাল চা খেতে কেমন লাগবে, সেটা  নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। ভবেন বাবু হাঁক পাড়লেন, ‘নিরু, তিনটে বন রুটি দে’। 

© সৌমিত্র বৈশ্য

Comments

Popular posts from this blog

দাদার কীর্তি

আবছায়া (পর্ব নয়) / সৌমিত্র বৈশ্য