দাদার কীর্তি
দাদার কীর্তি
সৌমিত্র বৈশ্য
বঙ্গ জীবনে একমাত্র সৌরভ গাঙ্গুলি, যেমন বাঙালির চিরন্তন ‘দাদা’, তেমনি সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরও দাদা। বাঙালি অবশ্য তাঁর নামের আগে বড়দা, ছোড়দা, মেজদা ইত্যাদি কোনোরকম ‘দা’ যুক্ত করেনি। অবশ্য খেলা ছাড়ার পর, তিনি যখন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করতে এলেন , তখন তাঁর সেই অনুষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছিল, ‘দাদাগিরি’। দাদাগিরি শব্দটি কিন্তু মোটেও নিরীহ শব্দ নয়। দাদা সম্বোধনটির মধ্যে আপাত নিরীহ ভাব আছে ; কিন্তু, দাদাগিরি যারা করেন, সেই সব দাদারা কিন্তু মোটেও নিরীহ নন। কারণ, এই দাদারা বাহুবলের অধিকারী হন এবং আর কোন কোন বলের খেলায় পারদর্শী, সেটা সাধারণ মানুষের বোধের বাইরে। এই সব দাদারা পথে বেরোলে, সামনা সামনি দেখা হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ, – যাদের আমরা বলি,-আমজনতা, - তারা খুব সমীহ করে চলেন। এমনকি তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে, কেউ কেউ আকর্ণ হাসি ঝুলিয়ে রাখেন মুখে। যদি একবার দাদার চোখে পড়ে যান। হয়তো দেখা গেল, দাদা তাকিয়েই দেখলেন না। কিন্তু দস্তুর হিসেবে তিনি মুখের হাসির ছবিটি ঝুলিয়েই রেখে দেন। একবার এক ভদ্রলোক এক দাদাকে দেখে এরকম হাসি মুখ করে অপেক্ষা করছিলেন, উল্টোদিক থেকে আসা দাদার যদি শ্রীদৃষ্টি তার উপর পরে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যত দাদা তার দিকে দৃকপাত না করেই চলে গেলেন। তিনি তবু হাসি মুখেই হেঁটে যাচ্ছিলেন। আর তখনই বাঁধল গোল। উল্টোদিক থেকে আসা এক দাপুটে রূপের অধিকারিণীর চোখে পড়ে যায় তার হাসি মুখ। এরা কেউ কাউকে চেনেন না। অতএব , এরকম আকর্ণ বিস্তৃত হাসির বিভ্রান্তিকর অর্থ করে ফেলেন সেই দাপুটে রূপসী। ঘটনাচক্রে, এই দাপুটে রূপসী আবার সেই দাদাটির আত্মীয়া, যে দাদার জন্য ভদ্রলোক হাসির আয়োজন করেছিলেন। এরপর তুরন্ত খবর যায়, দাদার কাছে। এরপর যা হলো, তাতে সেই ভদ্রলোক ভদ্র সমাজে মুখ দেখানো দুরস্ত, একমাস হাসতেই পারেননি।
আমাদের এতদঞ্চলে এরকম দাদা , মানে বাহুবল সম্পন্ন দাদা কম দেখা যায়। কেন কম দেখা যায়, সেটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ব বিভাগে, এর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা ও সেমিনার হতেই পারে। তবে হ্যাঁ, দাদা ছাড়া দুনিয়া চলে না। এটা একটা প্রাচীন প্রবাদ। সভ্যতার আদিম পর্বে মানুষ যখন দল বেঁধে ছোট ছোট গোষ্ঠী হয়ে থাকত, তখন কিন্তু প্রত্যেক গোষ্ঠীর মধ্যে একজন দাদা নিশ্চয়ই থাকত। এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। সুতরাং , বলা যেতেই পারে, দাদাত্ব ব্যাপারটা আমাদের প্রাগৈতিহাসিক উত্তরাধিকার। অনেকটা যেন এন.আর.সি-র সেই বিখ্যাত লিগ্যাসি তথ্যের মতো। সে যাই হোক, আমরা পাড়াতো এবং অঞ্চলিক, নিরীহ এবং সদাহাস্যময় এবং নিস্বার্থ পরোপকারী দাদাদের কথা বলব। এরা স্বভাবে রাড়ির বড়ো দাদার মত হন। আপনার কলে জল আসছে না, তিনিই আপনার একমাত্র সহায়। তাঁকে গিয়ে বলা মাত্রই তিনি আপনাকে নিয়ে জলের অফিসে যাবেন। সেখানে যাওয়ার পর দেখবেন, উনি অফিসের নানা বাবুটাবুকে টপকে সোজা ইঞ্জিনিয়ারের ঘরে গিয়ে হাজির হবেন। তারপর চেয়ার টেনে বসে, ইঞ্জিনিয়ারকে সোজা সোজা প্রশ্ন করে বসবেন, ‘ব্যাপারটা কী বলুন তো ? গোবিন্দ লেনের এগারো নম্বর বাড়িতে কেন জল আসছে না?’ । ইঞ্জিনিয়ার আমতা আমতা করবেন। ইনি তখন বলবেন, ‘কাল যেন সব ঠিক হয়ে যায়। আমি আর আসব না’। বলেই চেয়ারটা সশব্দে সরিয়ে উঠে পড়বেন। তখনই আপনার লঘু চিত্ত বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেছে। ঠিক পরের দিনই আপনার কলে গঙ্গা-যমুনা-সিন্ধু-শতদ্রু নদীর বান ডেকেছে। এবার আপনার লঘু চিত্ত বিস্ময়ে, ভক্তিতে গদগদ হয়ে গেছে! পাড়ার নর্দমা সাফাই হচ্ছে না। আপনাদের নর্দমা সাফ করিয়ে একেবারে স্বচ্ছ ভারত করিয়ে দেবেন। যে কোনো অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আপনি তাঁকেই পাশে পাবেন। তিনি যে শুধু আপনার উপকার করেন, তা তো নয়। তিনি সবার উপকার করেন। তাই, আপনারা জানেন যে, তিনি যেমন কাছের মানুষ, তেমনি তিনি কাজেরও মানুষ। আর , এটা কে না জানে , সব কাছের মানুষ কাজের মানুষ হয় না। এদের কেউ কেউ অকাজেই ব্যস্ত থাকে বেশী। নয়তো কাজ পন্ড করায় সবিশেষ দক্ষতা দেখিয়ে ফেলে। আপনারা এখন ভালোবেসে তাঁকে দাদা ডাকেন। সেই দাদা যদি একবার ভোটে দাঁড়ান, তো তাঁকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে আবির খেলতে কে না চাইবে। কিন্তু, ভোটে জেতার পর তাঁর ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আপনিও আর সহজে দাদার দেখা পান না। ফলে, তাঁর শূন্যস্থান পূরণ করতে আরেক জন দাদা আবির্ভূত হন।
এইসব দাদারা গোটা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডেই বিরাজমান। বরং আমাদের বঙ্গ জীবনে অধুনালুপ্ত সেইসব দাদাদের কথা স্মরণ করতে পারি, যারা আমাদের সমাজ ও সাহিত্যে, একদা প্রবলভাবে বিরাজ করতেন। এদের অবলুপ্তির একটা কারণ হতে পারে, আমাদের আধুনিক ছোট পরিবার, সুখী পরিবারের ধারণা। প্রাচীন কালে একেকটি যৌথ পরিবারে অনেক গুলো পুত্র সন্তান জন্মাত। ফলে, ক্রম নিম্নানুসারে জাত ভাইয়েরা ক্রম উর্দ্ধনুসারে জাত ভাইদের বিভিন্ন নামে ডাকত। যেমন, প্রথম যে পুত্রের জন্ম হতো, ‘বড়দা’ ডাকটা জন্মসূত্রে তার জন্যই সংরক্ষিত থাকত। এটা যেন রাজতন্ত্রের মতো ব্যাপার। জ্যেষ্ঠ পুত্র সিংহাসনের অধিকারী হতো। এই রীতির জন্যই দেখুন ভারতীয়রা দুটো মহাকাব্য এবং দুটো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পেয়ে গেল। এরমধ্যে একটি তো একেবারে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বলেই প্রসিদ্ধ। বঙ্গ জীবনে বড়দা আসার পর, আরেকটি ভাই বংশে না এলে তো বড়দা স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত হতে পারেন না। অতঃপর, বছর দেড় দুইয়ের মধ্যে আরেকটি পুত্র এলো বংশে। এরপর, নিয়মিত পুত্র সন্তানের আগমনে, বড়দা, মেজদা, সেজদা, ফুলদা ইত্যাদি সম্বোধন ভাইদের মধ্যে প্রচলিত হল। শেষ হতো ন’দা দিয়ে। আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে দেখেছি, ন’দা দিয়ে শেষ করা যায়নি। একজন এলেন কনেদা হয়ে, এরপর চূরাদা। এরা সকলেই সম্পর্কে আমার দাদু হতেন। তবে, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে, ওই মেজদাকে নাতি নাতনি স্থানীয় কেউ মেজ দাদু ডাকত না। সকলেই তাঁকে মেজদাই ডাকত। তবে,আমার খুব লজ্জা লাগত চুরা দাদু ডাকতে। কেনইবা তাঁর কপালে এই সম্বোধনটা বরাদ্দ হয়েছিল, সেটা এক অজ্ঞেয় রহস্য। বাড়ির বড়দারা সব ব্যাপারে শেষ কথা বলতেন। এতে কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার ছিল না। বরং বলা তার, এটা ছিল গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা। এইসব বিষয় নিয়ে অনেক বাংলা সিনেমা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে শ্রীকান্ত উপন্যাসে, মেজদা চরিত্রটি একেবারেই কাল্পনিক। বাস্তবের মেজদারা অত্যন্ত গোবেচারা, সর্বংসহা চরিত্রের অধিকারী হয়ে থাকেন। যৌথ সংসারে বড়দাসুলভ নিয়ন্ত্রক ভূমিকা মেজদার থাকে না। কিন্তু, মেজদা কিন্তু ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো। রাঙা পিসীর বাতের ব্যথার মালিশ আনতে , দুই ক্রোশ দূরে মেজদাকেই যেতে হয়। তবে, এইসব অবিচারের প্রতিবাদকল্পেই বোধহয় শ্রীকান্ত উপন্যাসের মেজদা এত কড়া হয়ে উঠেছিলেন। মেজদার কাছে এলে, ছোট ভাইদের সাতখুন মাফ, এহেন ধারণাকে, হয়তো তিনি সমূলে উৎপাটিত করতে চেয়েছিলেন। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, মেজদারা কখনোই এরকম হন না।
আন্তর্জাতিক দুনিয়াতেও বড়দা, মেজদা রয়েছেন। এরা সব বড়ো খিলাড়ি। এই আন্তুর্জাতিক দুনিয়ায় সকলেই কিন্তু বড়দা হতে চায়। একসময় আমাদের দুজন বড়দা ছিলেন। হিন্দি সিনেমায় এরকম দাদা-বড়দা বহুত দেখা যায়। গব্বর সিং ছিল ডাকাত সমাজের বড়দা। ওদিকে পুলিশ অফিসার ঠাকুরও আরেক বড়দা। ক্ষমতার অলিন্দে এক সাথে দুই বড়দা থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু চুনোপুটিদের তো কোনো না কোনো বড়দার স্যাঙাত হয়ে থাকতেই হয়। আর স্যাঙাতদের মুস্কিল বাড়ে, যখন দুই বড়দার মধ্যে বিরোধ্ বাঁধে। এসব ইতিহাস আমরা পার হয়ে এসেছি। এখন দাদা বলুন বা বড়দাই বলুন , তার কাজ হলো স্যাঙাতদের সামলে রাখা। এই ব্যাপারে বোম্বের সিনেমায় বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। এইসব সিনেমার নামও হয় রোমহর্ষক। সেইসব সিনেমার নামে ও সংলাপে রাস্তার পাশের কলের জলের মত, ঝরঝর করে খুন, বদলা, আগ, গোলা, ইনসাফ ইত্যাদি শব্দ ঝরতে থাকে। কিছুদিন আগেই একটা সিনেমায় দেখা গেল, এক দাদার ( ওরা আবার বলে ভাই) দুই স্যাঙাতের মধ্যে তুমুল মারপিট শুরু হয়ে গেল। এদিকে দাদার (ভাই) ব্যবসার তো বারোটা বাজার উপক্রম। তার নাম ডাব্বু ভাই। অবশেষে উপায়ন্তর না পেয়ে ডাব্বু ভাই, দুই স্যাঙাতকে নিয়ে, পাঁচতারা হোটেলে বসে উত্তম সুরা ও নৈশাহারে বসে। তারপর সব মধুরেণ সমাপয়েৎ হলো।
এই অবধি লিখেছি, এমন সময় ভবেশ ও ভবেন বাবু আমাকে ডাকতে,-- মানে নিরুর চায়ের দোকানের আড্ডায় যাবার জন্য,-- এসে লেখার শিরোনাম দেখে ফেলেন। ভবেন বাবু বললেন, ‘লেখার নামটা দিন কেলোর কীর্তি’।
Comments
Post a Comment