মাথা
মাথা
সৌমিত্র বৈশ্য
বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখটা দেখল সৌমেশ। দাড়িটা বড় হয়েছে। সাদার ভাগই বেশী । মাথায় হাত বুলিয়ে চুলটাও জরীপ করল। শেষবার কাটার পর চার মাস হয়ে গেছে। বাবার মত, তারও প্রতিমাসে চুল কাটার অভ্যাস। তার বাবা যে সেলুনে চুল কাটেন, সেও ওই সেলুনেই চুল কাটে। চুল যে কাটে, সে রতন, বড় নালার উপর বাঁশ দিয়ে মাচার মত করে, সেলুনটা বানিয়েছে । ইলেক্ট্রিক নেই। গরমে ফ্যান চলে না। এরমধ্যে চুল কাটার সময় রতন একটা সাদা তেলচিটে টেরিলিন কাপড়ের চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে দেয়; যাতে পোষাকে চুল না পড়ে। কিন্তু প্যান্টে চুল পড়ে। গরমের দিনে ওই কাপড়টা যখন গলায় বাঁধে , সেটায় আগে যে চুল কেটেছে, তার ঠান্ডা ঘাম টের পাওয়া যায়। তখন সৌমেশের গা শিরশির করে। ঘেন্না করে না কিন্তু। কতগুলো অনুভূতি কিশোর বয়স থেকেই, টের পেয়েছে সে, তার ঘৃণা নেই, হিংসা নেই; কিন্তু ভয় আছে প্রচন্ড । স্কুলে প্রতিদিন ভয় নিয়ে যেতো। যদি পড়া না পারলে মাস্টারের হাতে শাস্তি পায়। সেই ভয়ে সে রোজ মন দিয়ে পড়া শিখে স্কুলে যেতো। পড়া পারতও। তার পরীক্ষার ফলও ভালোই হত। তবু স্কুল জীবনে ভয় তার পিছু ছাড়েনি। বাড়িতে অন্য একটা ভয় ছিল। মা-বাবার মারামারি লাগত। বাবা তখন মাকে মাটিতে আছড়ে ফেলত। সে তখন মাকে বাঁচাতে বাবার হাতে কামড় দিয়ে ঝুলে থাকত। বাবা তখন মাকে ছেড়ে তাকে মারতেন। বেধরক মার। কাঁদতে কাঁদতে সে অজ্ঞান হয়ে যেত। কিন্তু জ্ঞান ফেরার মুহূর্তটা তার খুব ভাল লাগত। যেন লম্বা একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে সে আলোর রেখা দেখা পেল।ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে নিঃশ্বাস । বুক ভরে টেনে নিত বাতাস। আর সেই বাতাস, ভরে থাকত কামিনী ফুলের গন্ধে। সে এই অনুভূতিটা ফিরে ফিরে পেতে চাইত। নেশার মত লাগত, জ্ঞান ফেরার সময়। সে চাইত, বাবা মারুক। বেধরক মারুক। যাতে সে অজ্ঞান হতে পারে। আর জ্ঞান ফেরার সেই অনুভূতিটা ফিরে পায়। ওই বয়সে সে বাবাকে খুব ভয় পেত। মা'র কান্নাকে ভয় পেত। অন্ধকারকে ভয় পেতো। স্কুলের স্যারদের ভয় পেতো। স্কুলের মারকুটে সহপাঠীদের ভয় পেতো। মানুষ যখন আনন্দ করত, বিয়েতে, খেলার মাঠে, আড্ডায়, সিনেমা দেখে বা গান শুনে,--তার কোনো আনন্দ হত না। প্রেমে পড়ার বয়সে সে গুটিয়ে দূরে থাকত মেয়েদের থেকে। বস্তুত,ভয় ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি তার বোধে ধরা দিত না। বাবাকে কিশোর বয়স অবধি তীব্র ঘৃণা করছে। মাকেই তার পরম বন্ধু মনে হত। কিন্তু ঝগড়া, মারামারির পর, যখন আবার বাবার সাথে মা, হেসে কথা বলত, পালংকে বাবার গা ঘেঁষে বসে চা খেতো, তার ভীষণ রাগ হত মায়ের উপর। মা খুব সহজ সরল। কিন্তু মাঝেমাঝে মায়ের মাথার ভিতরটা ঝড়ে এলোমেলো হয়ে যেত। তখনই ঝগড়া, মারপিট হত। মা তখন বাবার সাথে শুতো না রাতে। সৌমেশের বিছানায় শুতো। আর সৌমেশ মায়ের আঁচলের গন্ধে ফিরে পেতো তার শৈশব । খুব ছোট্টবেলা মায়ের কোলে উঠলেই আঁচল চিবোত। চিবিয়ে চিবিয়ে মায়ের গন্ধ গিলে ফেলত।তারপর তার গায়েও মায়ের গন্ধ টের পেতো । মা ভীষণ ফর্সা, গোলগাল, মোটা। মা ফর্সা বলেই মায়ের গায়ে বাবার মারের দাগ নীল হয়ে ফুটে উঠত। সে পেয়েছে মায়ের রঙ আর লাবণ্য । মায়ের মধ্যে ছায়া ঘেরা,একটা টলমলে কালো দীঘি ছিল। সেই দীঘির জলে তার শৈশব পা দোলাত, ছলাৎ ছলাৎ শব্দ উঠত। মা বলত, দীঘিতে হাঙর আছে, কুমীর আছে। মানুষকে টেনে নিয়ে খেয়ে ফেলে। দীঘির পাড় ঘিরে যে বিশাল গাছ সব, যাদের ছায়ায় দিনের আলোতেও অন্ধকার হয়ে থাকে চারপাশ, সেই সব গাছে থাকে হাজার বছরের প্রাচীন মায়া পিশাচিনী। যে দীঘির গল্প বলত মা, সেটা অন্য দীঘি,রূপকথার। রূপকথার দীঘি আর মায়ের মধ্যে যে দীঘিটা সে দেখত, সব কেমন গুলিয়ে যেত। দু'দিন পর মায়ের রাগ কমে যেতো। ফের মায়ের মাথার ভিতর হাওয়া বইত। মায়ের বাপের বাড়ী শনবিল অঞ্চলে। মাথার ভিতরের হাওয়াটা, মা শনবিল থেকে নিয়ে এসেছিল। বিলের জলে কত গাছ। সেই সব গাছে কি থাকে মায়া পিশাচিনী? ঘাটের কাছে একটা নৌকা দেখেছিল। শ্যাওলা পড়ে গেছে। তার ভিতর একটা সবুজ রঙের কাছিম। দাদুর বাড়ীতে ছিল পুকুর, যা সাঁতরে পেরোনো যায় না। পুকুর ঘিরে ঝাঁকড়া মাথার গাছ সারিসারি। কোনো এক কালে নদী থেকে এই পুকুরের জন্ম হয়েছিল। দাদুর বাবার বাবা সেই পুকুরের পাশে ঘর বানায়। জমি কেউ কিনত না তখন। সুপুরী, নারকোল, কলাগাছ লাগিয়ে জমির সীমানা টানত। এইসব তখনকার কথা ; যে যতটা পেরেছে, জমি নিজের অধিকারে নিয়েছে। বড় বড় গাছ ছিল, বহু শতাব্দী প্রাচীন। মা সেই যে মায়া পিশাচিনীর গল্প শুনিয়েছিল, তার মনের মাথার ভিতরে,-- শ্যাওলা পড়া গাছ, আবছা অন্ধকার, পুকুরের কালো জল, বুড়ো কাছিম, দেড়শো বছর বয়স্ক বিশাল মাছ, যাদের আঁশ হাতের তালুর মত বড় এবং খুলির মত শক্ত,-- সব ঢুকে গেল; আর জটিল হয়ে গেল মাথাটার ভাবনা-বিন্যাস। আয়নায় মাথার চুল দেখতে দেখতে সে ভাবে, থানা থেকে চুলটা কাটিয়ে আসতে হবে। এই ভাবনাটা তৎক্ষণাৎ শুধরে নিল। থানা নয়, সেলুনে। সে টের পায়, খাকি রঙের থানাটা, তার মাথার ভিতরে, একেবারে ঘাঁটি গেড়ে বসে গেছে। চুলটা আজ কাটতেই হবে। একেবারে ছোট করে। মা বলে, চুল ছোট হলে, মাথার ভিতরে বাতাস খেলে। হাওয়ার সোঁ সোঁ শব্দ হয়, ঝড়-বাদলের আঁধার রাতে। তখন বিদ্যুৎ চলে যায়। আলো নিভে গেলে, শুরু হয় ঝড়ের রাত। সে জানে, মায়ের মাথার ভিতরে, লম্বা একটা বারান্দা আছে। সেটা মাটি থেকে অনেক উঁচুতে। সেই লম্বা বারান্দায় মা, এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে পায়চারী করে। মা যখন বারান্দার শেষ প্রান্তে চলে যায়, মাকে তখন বিন্দুবৎ মনে হয়। আবছা, কালো, ছোট্ট একটা বিন্দু। মা গায় তখন,– দূরে কোথায় দূরে দূরে…। গানের শেষে, 'অচিনপুর' আছে। এ গান তো মায়ের জানার কথা নয়! মা তবে গানটি শিখল কী করে ? মা তো গানই জানে না। তবে কি রেডিও থেকে শুনে, শিখেছে এই গান? ওই ঝড় এলে, মাথার ভিতরে হাওয়ার তরঙ্গ উত্তাল হলে, মা চলে যায়, সেই গোপন বারান্দায়। তার নিজস্ব বারান্দায় । মন্থর পদক্ষেপে হাঁটে। এত মন্থর, যে মনে হয় না, হাঁটছে। অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে থাকলে, দেখা যায়, মা ধীরে ধীরে, বিন্দুবৎ হয়ে গেছে। ঝড় থেমে গেলে, বিদ্যুৎ আসে, সাপের ছোবলের মত। মা ফের কাজে লেগে পড়ে। অনেকদিন ভেবেছে, মায়ের তো লম্বা চুল, মাথায়। তবে হাওয়া ঢোকে কী করে ? পরে বুঝতে পারে, এই হাওয়া মা বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে। বাড়িতে একটাই লন্ঠন। রোজ সেটার চিমনি সাবান জলে মেজে, চকচকে করে রাখে মা। রাতে সেটা জ্বলে বাবার ঘরে। বাবা অন্ধকার ভয় পায়। চিমনিতে কালো দাগ পছন্দ করে না। বাবার মাথা ভরা কালো কুঞ্চিত অন্ধকার বাবড়ি চুল, ঘাড় অবধি নেমেছে, অশ্বত্থের আদিম ঝুরির মতন। কিন্তু মা তাকে বলে চুল ছোট রাখতে । সে তাই করত। বাথরুমে দাড়ি কাটার সময়, বেসিনের উপরে যে পারদ ওঠা তিরিশ বছরের পুরাতন আয়নাটা আছে,যাতে সন্ধ্যের পর কেউ মুখ দেখে না, বাস্তবিকই, মা'র নিষেধ আছে, রাতের বেলা আয়নায় মুখ দেখতে নেই, সেই আয়নায় চেয়ে দেখে, মাথার চুল অনেক বড়ো হয়ে গেছে। সেজন্যই মাথায় হাওয়া ঢোকে না। ভাবে, আজ একবার থানা থেকে চুল কেটে আসতে হবে। ভাবার পর মুহূর্তে খেয়াল করে, তার মাথার ভিতরে থানা ঢুকে গেছে। আর , সেজন্যই সারাক্ষণ মাথার ভিতরে এত হট্টগোল, আর্তনাদ, কালশিটে ছায়া। মাঝেমাঝে হুটার বাজে। বুটের শব্দ হয়। ভারী বুট। কী ওজন সেই বুটের ! মাথাটা তখন বুটের চাপে টলমল করে ওঠে। সে বুটের দিকে তাকায়। বুট থেকে চোখ তুলে উপরে তাকায়। যেন একটা বিশাল অন্ধকার গাছ, আকাশ ছুঁয়ে আছে। আকাশের আলো দেখা যায় না। কালো কালো মেঘ, উড়ছে সেখানে। সঙ্গে কালো হাওর থেকে উড়ে আসা বাতাস। সে মাথা ঝাঁকায়। খেতে বসেও তার মনে হয়, একটা খাকি উর্দি আর একটা রাইফেল তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে কোনোদিকে তাকাতে সাহস পায় না।
– আপনার নামে একটা সমন আছে ।
– আমার নামে ? কী করেছি আমি ?
– আপনি আগামী দশ তারিখ সকাল দশটায় থানায় আসবেন। সই করে সমনটা নিন।
অফিসে সবাই দেখছে। সে টের পাচ্ছে, বুকের ভিতরটা কেউ দুমড়ে দিয়েছে বুলডোজার দিয়ে। সার বেঁধে বুলডোজার পিঁপড়ের মত ছুটে আসছে। দম আটকানো অবস্থায় চেয়ারে বসে থাকে সে। কেউ আসুক তার পাশে, কেউ তার বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে দিক, সে আশা করতে থাকে। কেউ আসে না। সবাই নিজের চেয়ারে বসে কাজ করে যাচ্ছে। সমনটি সে পড়ে। কে অভিযোগ করেছে, কিচ্ছু লেখা নেই। শুধু কতগুলো ধারা লেখা আছে। থানায় গেলেই জানা যাবে, কে এই অভিযোগ করেছে। খাকি পোশাক সেসব কিছু বলেনি। সে জানতে চেয়েছিল, ওই খাকি লোকটার কাছে, যে এবার তার কী করণীয়, সে কি গ্রেপ্তার হতে পারে, সে কি আগাম জামিন নেবে, সে কি উকিলের পরামর্শ নেবে ? খাকি লোকটা পান তাম্বুল চিবিয়ে হাসে। নজর করে, খাকি লোকটার মুখটা একেবারে গোল। ফুটবলের মত। তিনটে রাইফেল চলে গেল, হাসি মুখে। কাজ করতে পারছে না অফিসে বসে। সে বেরিয়ে পড়ে অফিস থেকে। অনির্দিষ্ট ভাবে এলোমেলো হেঁটে , সে এক সময় নজর করে, বিশাল প্রাচীন, হাজার বছরের বেশী প্রাচীন, বট গাছের পাশেই থানা। সেই থেকে শুরু। সে রোজ অফিসে আসার পর, নিয়ম করে হেঁটে , দাঁড়িয়ে থাকে বট গাছের ছায়ায়। একদিন নিয়ম ভেঙে অফিস থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য, অফিসের কর্তা তাকে চিঠি দেন। কেন কাজে গাফিলতির জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না, সাত দিনের মধ্যে জানাতে হবে। এবারও বুলডোজার ছুটে আসে। কেউ আসে না। তেষ্টা পায়। সে চিঠিটা বুক পকেটে নিয়ে, ফের বেরিয়ে পড়ে। অনির্দিষ্ট ভাবে এলোমেলো হেঁটে , সে এক সময় নজর করে, বিশাল প্রাচীন, হাজার বছরের বেশী প্রাচীন, বট গাছের পাশেই থানা। সে দাঁড়িয়ে থাকে বট গাছের ছায়ায়। কালই তাকে আসতে হবে এখানে। গেট থেকে সে থানার দিকে তাকিয়ে থাকে। বট গাছের ছায়া , অপরাধীর লাশের মত, ভারী হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। এখানেই সে আসবে কাল। বাড়িতে মাকে বলেনি। বাবাকে বলার প্রশ্নই ওঠে না। একসময়, বাবাকে দেখে, থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আচ্ছা, যদি আটকে রাখে ওকে, মা চিন্তা করবে। খুঁজবে, কোথায় গেল ছেলেটা।
সে দশটার আগেই চলে আসে থানায়। বসে থাকে। খাকি পোশাক , অনেক অনেক খাকি পোশাক, চারপাশে। কেউ ডাকে না তাকে। সাড়ে এগারোটা বাজার পর সে খাকি হাফ প্যান্ট পরা একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করে, কার সাথে সে দেখা করবে। পকেট থেকে সমনটা বের করে দেখায়। ছেলেটি ওটা নিয়ে রেখে দেয় তার টেবিলে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে, সে জিজ্ঞেস করে, এবার তাকে কী করতে হবে। খাকি হাফ প্যান্ট তার কথা শুনতেই পায় না। সে তার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। আরো অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করার পর, সে আবার জিজ্ঞেস করে, তাকে এবার কী করতে হবে। খাকি হাফ প্যান্ট তার কাছে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড চায়। সে বলে যে এসব সে নিয়ে আসেনি। হাফ প্যান্ট তাকে বলে,-- যাও, ওগুলো নিয়ে এসো। সে বলতে চায় যে সমনটাই তো সে এনেছে, তবে আর ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড কেন লাগবে। হাফ প্যান্ট বুঝতে পেরেছিল, সে কী বলতে চাইছে। তাই, বলে যে এগুলো ছাড়া তার পরিচয় অসম্পূর্ণ। মুল অভিযুক্তরা টাকা দিয়ে অন্য মানুষকে পাঠিয়ে দেয়, সাজা খাটার জন্য। এই কথা শুনে সে টের পায়, তার পায়ের হাড় গলে যাচ্ছে, মোমের মত। সে পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারছে না আর। টেবিলের এক পাশ ধরে নিজেকে সামলে নেয়। ধীরে ধীরে তার পায়ের হাড় শক্ত হয়ে ওঠে। সে দাঁড়াতে পারছে। এখন তাকে অনেকটা দূর , বাড়িতে যেতে হবে, এসব আনার জন্য। সে রাস্তায় নামে ঠিকই, কিন্তু সে এখনো থানার ভিতরেই রয়েছে। টুকটুক রিক্সাটা থানার এক বারান্দা থেকে অন্য বারান্দায় মোড় নেয়। সে গেট খুলে বাড়ির ভিতরে থানার ভিতরে বাড়ির ভিতরে ঢোকে। মা তাকে এই সময়ে দেখে অবাক হয়। সে যখন কাগজ গুলো খুঁজছিল, মা তার পাশে এসে দাঁড়ায়। মায়ের মাথার চুলে, ঘন কালো চুলে, হাওরের বাতাসে ভাসা সোঁদা গন্ধ , নাকে এসে ঢোকে। সঙ্গে ভেসে আসে হাওয়ার ঘূর্ণি। সেই ঘূর্ণি তার মাথার ভিতরে ঢুকে যায়। কী আশ্চর্য, হাওরের জলও ঢোকে, ঢেউ উথলে ওঠে, আর জলে ভেসে কাছিম, সরীসৃপ , মাছ,-- সব ঢুকে পড়ে তার মাথার ভিতরে। কাছিম বড়ো অদ্ভুত প্রাণী। বিপদের সম্ভাবনা অনুভব করলেই, শক্ত খোলের ভিতর ঢুকিয়ে নেয় মাথা। মানুষ পারে না। পরিবর্তে মানুষ অনেক কিছু করে, বিপদ থেকে বাঁচতে। সে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড নিয়ে থানায় ঢোকে। অভিযোগকারী তখনো আসেনি। থানায় বড়ো স্যারও আসেননি। রাইফেল, লাঠি, বুট, খাকি পোশাক ,-- এরাই ঘুরছে। সে বিশাল একটা সাদা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘড়িটায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ছায়া লেগে আছে। রোমান সংখ্যা। কী গম্ভীর তার এলার্ম। অভিযোগকারী এসে ঢোকে। সঙ্গে বড়ো স্যার। অভিযোগকারীকে প্রথম চিনতে পারেনি। হাফ প্যান্ট চিনিয়ে দেয়। বড়ো স্যার তাকে ডেকে নেন। অভিযোগকারী দীর্ঘাদেহী। কপালে হলুদ ও লাল রঙ মেশানো তিলক। হাতে প্রচুর লাল-হলুদ সুতো বাঁধা। গলায় সোনার চেনে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের লকেট। সে খুব বিনীত ভাবে বলে, – আমি তো আপনার সাথে কোনো অন্যায় আচরণ করেছি বলে মনে পড়ে না।
আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেননি।
দিয়েছি। তবে, একটু পরে। আমি একটা হিসেব করছিলাম।
আপনার শাস্তি হওয়া দরকার। জনগণের সেবার জন্য আছেন আপনারা। তাদের যদি সঠিক সেবা না দেন, তবে আমাদের দেশের উন্নতি ব্যাহত হবে। আমাদের সরকার, আমাদের কর্মচারী। তারপরও আমরা অবহেলিত থাকব কেন ? আমরা যে ট্যাক্স দেই , সেই টাকায় আপনারা ভাত খান।
স্যার, ভুল হয়ে গেছে। মাফ করে দিন।
এই কথাটা তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর সে সোজা অভিযোগকারীর পায়ে পড়ে যায়। তখন সে নিজেই অবাক হয়। মাথার ভিতরে যে সরীসৃপটা ঢুকেছিল, সেটা ল্যাজের ঝাপটায় তাকে, অভিযোগকারীর পায়ে ফেলে দেয়। এবং সে টের পায়, চট করে পায়ে পড়ে যাওয়া, খুব সোজা। সে পেঁচিয়ে ধরে অভিযোগকারীর দুই পা। এবং সে আরাম বোধ করে। কাছিমটা হাসে।
অভিযোগকারী লিখিত ভাবে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। কালো প্যান্ট, কালো কোট কালো টাই, সাদা শার্ট পরা বিশালদেহী অভিযোগকারী চলে যায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে, বড়ো স্যারের সামনে। তিনি বলেন, এখন যেতে পার। তবে যখন আমরা ডাকব, তখন আসতে হবে।
কিন্তু স্যার, অভিযোগ তো প্রত্যাহার করেছেন উনি।
তাতে কী ? ফাইল তো খুলে গেছে। এবার কেস ডায়েরি যাবে কোর্টে। তখন কোর্ট তোমাকে ডাকবে।
সে থানা থেকে বেরিয়ে অফিসে ঢোকে। সোজা ঢুকে যায় কর্তৃপক্ষের ঘরে। উনি আলাদা ঘরে বসেন। এবারও সে কর্তৃপক্ষের দুই পা পেঁচিয়ে ধরে এবং বলে যে সে আর অফিসের বিধি ভঙ্গ করবে না ; অতএব তাকে যেন মাফ করে দেওয়া হয়। তাকে মাফিনামা দেওয়া হয়।
রাতে সে মায়ের পাশে শুয়ে, মায়ের মাথার চুলের গন্ধ নেয়। বুক ভরে গন্ধ নেয়।হু হু করে সব বাতাস নিয়ে শনবিল ছুটে আসে । মা তখন গান গায়। ঘুম চৌপাট হয়। সারারাত গান গায় মা। পাশে শুয়েও মা দেখতে পায় না, বা বুঝতে পারে না, সৌমেশ সরীসৃপ হয়ে গেছে। সে মায়ের জটা ধরা চুলের জংগলে ঢুকে যায়। এখন তারা ভালো আছে। বাবা মাকে আর মারে না। আলাদা ঘরে শোয়। হারিকেন জ্বলে ঘরে। সেও এখন সরীসৃপ। রাস্তায় তাকে দেখলে , লোকে তাকে মারতে আসে । সে তখন কাছাকাছি গর্তে সেঁধিয়ে যায়।
এতদিন পর, সে বোঝে কাছিম কী করে এবং কেন বিপদের আশঙ্কায় মাথা ঢুকিয়ে নেয়। সরীসৃপ হয়ে যাওয়ার পর, সৌমেশ জেনেছে, নিজেকে বদলে দিলে, যাতে বাইরের কারো কাছে , প্রতিরোধের শঙ্কা নেই বলে প্রতিভাত হতে পারলে আর ভয় নেই। মা যেমন মাথার ভিতরে শনবিলের হাওয়া বয়ে নিয়ে বেরোয়।
Comments
Post a Comment