আবছায়া । পর্ব চার

        কোনো বাড়ীতে, মৃত্যুর শীতল ছায়া যখন পড়ে, কয়েকটা দিন, সেই ছায়াতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে গোটা বাডী; ঝড়ের আগে ও পরেও কিছুক্ষণ যেমন,-- স্তব্ধ, নিঃসাড় হয়ে পড়ে মানুষের মন, ঝড়ের অশনি তান্ডবে, তার বিধ্বংসী রুদ্র নৃত্যে, প্রলয়ের অভিঘাতে, বিলয়ের মুখোমুখি দাঁডিয়ে,  বিহ্বল, হতচকিত এবং গতিহীন হয়ে পড়ে মানুষ,-- তেমনি, মৃত্যুর খুব কাছাকছি এলে, স্তব্ধ, নিঃসাড়, বিহ্বল, গতিহীন হয়ে যায় মানুষ; মৃত্যু পাষাণসম, এর ভর বাড়ীর সব ক’টি মানুষকে স্থবির করে দেয়, স্থবিরতার এই আগ্রাসী বাঁধন, আহ্নিক গতির কাছে একসময় পরাস্ত হয়ে যায়, মৃত্যুর চারদিন পর, খানিকটা লঘু হতে থাকে শোকের আবহ, গৃহবন্দীদশা কাটে, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে, জীবন উষ্ণ, মানুষ নাই উষ্ণতা খোঁজে, সান্নিধ্য চায় অপর মানুষের, তখন কতো কাজ এসে জুড়ে যায়, মৃত্যুর অশৌচস্পর্শ মুছে ফেলতে হয় বলে, এত কাজের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে,আহার্য ও পানীয়ের রীতিও বদলে যায়, এমনকি একদিন আমিষ খেতে হয়, দেহলতাকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে, শুধু হতভাগ্য বিধবাকে আমিষ দেওয়া হয় না, দিদা তো মাছ ছাড়া খেতেই পারেন না, পার্বণে, উৎসবে, মাছই দিদার একমাত্র প্রিয় আহার, দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে, সেও তো কম করে পঞ্চাশের উপরেই হবে, মুখে ভাত পড়ার পর থেকেই, কম করে পঁচাত্তর ধরলে, এত দীর্ঘ কালের  অভ্যাস ও রুচি, একদিনে পাল্টানো বড়োই কঠিন, আত্মসংযমের, রসনাপীড়নের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে, অবশিষ্ট জীবন কাটাতে হবে দিদাকে, বিধবার বেশি দিন বাঁচতে নেই এটাই ছিল সমাজের রীতি, না হলে সতীদাহ হতোই না, বৈধব্য তাই যেন  সংযম ও শুচিতার ব্রত হয়ে ওঠে, আমৃত্যু যা পালন করে যেতে হবে এই বিধবাকে, বিবাহিত পুরুষের মৃত্যু, তার জীবনসঙ্গিনীকে খরতপ্ত নিয়মের, আচারের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলে, দিদার জন্য কষ্ট হয়, যে মানুষটি নানা স্বাদের আমিষ রান্নায় পারদর্শী ছিলেন, যিনি এত সব খাওয়াতে ভালোবাসতেন, তাকে আর আমিষ স্পর্শ করতেও দেওয়া হবে না, আর খাওয়া হবে না এইসব সুস্বাদু আমিষ পদ,যা এজীবনের মতো এবার স্মৃতি হয়ে গেল ; এখানেও মৃত্যুর অপূর্ব সাপলুডো খেলা, একমাত্র মৃত্যুই পারে, মানুষের জীবন থেকে ফুলসাজা একটি ফুলদানীকে, টেবিল থেকে তুলে নিয়ে শূন্য ফুলদানীকে, স্মৃতির কুলুঙ্গীতে রেখে দিতে পারে, লোকচক্ষুর আড়ালে, ধুলায় ধূসর বিবর্ণ হতে থাকে একসময় পিত্তল নির্মিত সেই ফুলদানী
                বহুদিন পর বুদ্ধ আজ মোড়া পেতে বসেছে বাগানে; বাগান এখনো সাজে, মায়ের লাগানো ফুল গাছে, তেমন বাহারী কিছু নয়, কিছু গেন্দা ফুল, উজ্জ্বল হলুদ রং, কিছু ছোট, কিছু বড়ো, আর আছে সামান্য কিছু গোলাপের গাছ, ফুল তেমন সতেজ, সবল নয়, পাপড়িও কমে গেছে অনেক, বুদ্ধ তার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিল, মায়ের আফসোস শুনে, বন্ধুটির নানা রকম ফুল গাছ, বাহারী গাছ আর সারের পারিবারিক ব্যাবসা আছে, সে বলল, কলম করা গাছে এক বছরই সুন্দর ফুল হয়, তারপর গোলাপের স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য্য ম্লান হতে থাকে, গাছের ডালপালা বর্ষায় ছেটে দিতে হবে, গোড়ায় গোবর দিতে হবে, সেই ম্লানমুখী গোলাপী গোলাপ, ঠিক গোলাপের মতোই দেখতে, ফুটেছে এবারো, সামান্য বাতাসে যাদের পাপড়ি, ঝরে পড়ে যায় মাটিতে, এই ফুল ঠাকুরের পায়ে দেন না মা, গেন্দা,-- যেগুলো স্বাস্থোজ্জ্বল,-- গেগুলোই স্থান পায় ঠাকুরের চরণে, শ্বেতচন্দনে চর্চিত হয়ে, সাথে থাকে বারোমাস ফোটা, লাল, সাদা, ঈষৎ গেলাপী কিছু জবা, — সাদা, ও গেলাপী  জবা, মায়ের গর্বের সংগ্রহ, অনেকেই এই দুই জবার ডাল চেয়ে নিয়ে যায়, এগুলো মা এনেছিলেন তাঁর মামার বাড়ি, পশ্চিমবঙ্গের শান্তিপুর থেকে, তাদের বাড়িতে এই দুটো ভিন রঙের জবা গাছকে কখনো কখনো শান্তিপুরী জবাও বলা হয়, বাবা একদিন তামাসা করে বলেছিলেন,-- এতদিন জানতাম শানিপুরী ধুতি হয়, শাড়ী হয়; জবাও যে হয়, সেটা জানা ছিল না; এতে সেদিন মায়ের খুব অভিমান হলো, বাবা এরপর আর কোনোদিন শান্তিপুরী জবা নিয়ে তামাসা করেননি, কিন্তু সেই দুটো গাছের ডালকে, শান্তিপুর থেকে আনার পর্বের গল্প, মায়ের কাছে অনেকেই শুনেছে, বাধ্য হয়ে বুদ্ধরাও ভাইবোনে মিলে অনেকবার শুনেছে, মুখস্থ হয়ে গেছে শুনে শুনে, এবং বুদ্ধ খেয়াল করেছে যে মায়ের স্মৃতি এত প্রখর যে একটি গল্পের প্রতিটি পর্ব আট-দশবার বলার পরেও, এগারো নম্বর গল্পেও, গল্পের বাক্যবিন্যাস সহ, ঘ্টনার বিবরণ হুবহু একই থাকে, মনে হয় যেনা টেপরেকর্ডারে বাজানো হচ্ছে বা কোনো ডায়েরী থেকে পড়ে শোনানো হচ্ছে, মায়ের জীবনের গভীরতম সংরাগ এই দু'টি জবা গাছের প্রতি
           বাবার দিকে তাকালে, আজকাল বুদ্ধর হৃৎকম্প হয়, পরীক্ষার ফল বেরোবার সময়় এগিয়ে আসছে দ্রুত, তারপর দু’জনের মাঝখানে একটি অবধারিত বিস্ফোরণ দেখতে পায়, যদিও পরীক্ষার পর, বাবা যখন পরীক্ষা কেমন হলো জানতে চেয়েছিলেন, সে জানিয়ে দিয়েছিল যে পরীক্ষা ভালো হয়নি, বাবার মুখটা নিষ্প্রভ হয়ে যায়, এরপর আর কোনো কথা হয়নি, তবে বাবা যে তার গতিবিধি সম্পর্কে সমস্ত খবর রাখেন, সেটা জানত না তখনো, পরে বুঝেছিল,-- বাবা তো এক আশ্চর্য মানুষ, নিজের ছাত্রদের কৃতিত্বে সদা গর্বিত, সবাই তো আর সমান মেধাবী ছাত্র হয় না, তাদের জন্যও বাবা প্রশংসায় অকুণ্ঠ,-- যতোটা পেরেছিস, সেটাই বা কম কিসে,-- যারা একটু কম নম্বর পেলো, তাদের জন্য এই ছিল বাবার আন্তরিক প্রবোধ, শুধু তার বেলায় বাবা চির অসন্তুষ্ট, হয়তো সব বাবারাই নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে এমনই হয়ে থাকেন, তাই বা হবে কেন, মিঠুনের বাবা তো মিঠুনের লেখাপড়া নিয়ে কিছুই বলেন না, অবশ্য তিনি নিজেই তো ঘরের আগল ভেঙে বাইরে চলার মানুষ, নক্সাল রাজনীতি করে জরুরী অবস্থার সময় জেল খেটে এসেছেন, একদিন জিজ্ঞেস করেছিল তাঁকে, এখন তাঁর দলের খবর কী, — স্পষ্টত কিছুটা হতাশ, তবু হাল ছাড়েননি, টলেনি আদর্শের প্রতি, দলের প্রতি এতদিনের বিশ্বাস, – এই বিশ্বাস শব্দটা তাকে বড়ো ভাবায়, মা যে ঠাকুর পুজো করেন এত নিষ্ঠা সহকার, সেটাও তো একরকমের বিশ্বাস থেকেই করেন, বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বর বলে কেউ আছেন, মিঠুনের বাবা বিশ্বাস করেন যে এই দেশে একদিন বিপ্লব হবে, কৃষকরা নেতৃত্ব দেবে সেই বিপ্লবে, – বিশ্বাস করা বা আস্থা রাখার মধ্যে, যুক্তির ভিতটা কোথায়, বুদ্ধ বুঝে উঠতে পারে না, বই পড়ে এই পার্টিকে যতোটা বুঝেছে, মার্ক্সবাদকে যতোটা বুঝেছে, তাতে যুক্তির কথা আছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মন তো বিচিত্র সব খাতে বইতে চায়, সব মানুষের চিত্তবৃত্তি এক ছাঁদের হয় না, যুক্তির মধ্যে একটি নিয়ম নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা থাকে, সেটা যূথবদ্ধ মানুষের ভাবনাকে, আবেগকে কতটা কীভাবে আলোড়িত করবে, তা আগে থেকে বোঝা যাবে কিনা,এ নিয়ে একটা ধন্দ ঝড়া পাতার মতো তার মনে কেবলি উড়ছে ইদানীং
             ফুল, যার নাম মেট্রিকের এডমিট কার্ডে, শাশ্বতী হতে গিয়ে, ভুল করে স্বাতী হয়ে গেল, সেই ভুল আর শোধরান হলোই না, একটি ভুল নাম বা পড়ে পাওয়া নাম পরিচয় দিয়ে শুরু হল যার জীবন,যে এক দেশে জন্মেছে, কিশোরী হয়েছে, ধর্মের কারণে  নিরাপত্তার অভাবে যাকে মা-বাবা, পরিচিত পরিবেশ, বন্ধু আর পুকুর-দিঘী-নদী- বৃক্ষের ছায়া,-- সব ফেলে চলে আসতে হলো ইন্ডিয়ায়, বাংলাদেশের এখনো সে এই দেশকে  ইন্ডিয়া বলে, মুক্তিযুদ্ধের আগের দিনগুলো তার মনে আছে, শেখ মুজিবকে যেদিন খুন করা হলো, সেদিনটা প্রবল আতংকে কেটেছে বাড়ির সবার, তাকে নিয়েই ছিল সবার আতংক, সবার আতংক তার মনেও আতংকের ঠান্ডা বাতাস বইয়ে দিল, তখন তো সে রীতিমত কিশোরী, দোতলার একেবারে পিছনের ঘরে, দিনরাত দরজা বন্ধ করে থাকতে হতো তাকে, ভয়ে রাত্রে বারবার ঘুম ভেঙে যেতো, বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, ওকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেবেন, সেটা শুনে আরো মন খারাপ হয়ে যায় তার, একসময়  স্কুল খুললেও যাবার উপায় নেই, লেখাপড়া লাটে উঠল, ইন্ডিয়া যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায নেই, শিলচরে এসে অবাক হয়ে গেল, এখানে সবাই বাংলায় কথা বলে, মুসলমানও আছে প্রচুর, একদিন সে নিজেই অবাক হয়ে অনুভব করে যে, দেশের আতংক আর ছেডে আসার মন খারাপ মুছে যাচ্ছে তার মন থেকে, মা-বাবা-দাদাদের জন্য মন খারাপ হয়,তখন খুব অভিমান চেপে বসে তার মনের ভিতর, দেশের পড়ার সাথে এখানের পড়ার তালমিল করতে পারছিল না, অঙ্ক আর ইংরেজি,-- কিছুই পারছিল না, এই কথাটি মনে পড়তেই হৃদয় যেন তার দুলে ওঠে বসন্ত বাতাসে, হৃদয় কেন চঞ্চল হলো, কেন হয় চঞ্চল, বোঝে না বোঝে না বুঝতেও চায় না মন, বুদ্ধ`দা হাত ধরে টেনে তুললো সেই অতল থেকে, এভাবেই একদিন টের পায় বুদ্ধ`দা দেরিতে এলে বা হঠাৎ করে একদিন না এলে, সেদিন তারপরের দিন ভালো লাগে না কিচ্ছুই ভালো লাগে না, খালি মনে হতে থাকে কেউ নেই কিছু নেই তার, নিকষ অন্ধকার হয়ে যায় মন, কিন্তু, বুদ্ধ`দা আসার পর লহমায় উবে যায় মনের সকল আঁধার,জ্বলে ওঠে আলো, এই কথা কাউকে বলতে পারেনি সে, স্কুলেও তেমন বন্ধু নেই কেউ যে মনের দোসর, বুদ্ধদাকে বলার তো সাহসই ছিল না, তখন সে ক্লাস টেন, সদ্য উঠেছে, অংকের ভীতি আর নেই, একদিন বুদ্ধদার চোখে দেখেছিল অপার মুগ্ধতা, শুনেছিল মেয়েদের মন নাকি সহজাত ক্ষমতায় পড়তে পারে পুরুষের চোখের সব ভাষা, সেদিনও ছিল তেমন একটি দিন, দিন নয়, সন্ধ্যার স্তিমিত আলো ছিল জানালার ওপাশের পুকুরের ঘাটে, আর ছিল জোনাকির আলো, খুব প্রগল্ভতায় পেয়েছিল তাকে, তার অস্তিত্বে ভার ছিল না, পালকের মতো কোনো এক ঘূর্নিতে ভাসছিল সে, ককলকাতায় এসে সুন্দর কিছু দেখলেই মনে হয় বুদ্ধদা যদি থাকত পাশে, যা স্বভাব ওর,-- নির্ঘাৎ মাস্টারি করে কলকাতার ইতিহাস বোঝাত, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে এই কথা মনে হয়েছিল, দেখেছিল সবুজ ঘাসের উপর একটি ছেলে ও মেয়ে পাশাপাশি বসে আছে, এই দৃশ্য দেখে মুহুর্তে  ছলকে ওঠে বুকের রক্ত, স্পর্শ যে কী শিহরণ জাগায়, একদিনই টের পেয়েছিল, এটা সে বাকী জীবন লুকিয়ে রাখবে, বলবে না কাউকে কোনোদিন,না, বুদ্ধদাকেও না, তবু কেন আজ  তার মন ফিরে পেতে চাইছে সেই স্পর্শের তাপ, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের চত্বরে দাঁড়িয়ে, মনের প্রগল্ভতায় হেসে ফেলে ফুল, ওড়না দিয়ে মুখে চাপা দেয়,  মানুষের মন কখনো কখনো বড়োই অবুঝ হয়ে যায় 

Comments

Popular posts from this blog

বিশেষজ্ঞ

দাদার কীর্তি

মাথা