কূটকচালি সনাতন বিশ্বাস উবাচ


 

    রাজনীতির মিউটেশন



       সম্প্রতি চাকুরী হইতে সেবা নিবৃত্ত হইয়াছি। বৃদ্ধ বলদের স্কন্ধ হইতে সরকার গুরু দায়িত্বের জোয়াল তুলিয়া লইয়াছে। প্রাতঃকাল হইতে উর্ধশ্বাসে দফতরে ছুটিবার তাগাদা নাই। চা-বিস্কুট সহযোগে ‘বার্তালিপি’ পত্রিকাখানা আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া, বাজারের থলি হস্তে, হেলিয়া দুলিয়া বাজারে গিয়া নয়ন ভরিয়া নতুন আলু, লঙ্গাই বেগুন, ফুল কপি, সীম ইত্যাকার শব্জি দেখিয়া পুলকিত হই। মাছ বাজারে গিয়া জলের সোনালী ফসল হইতে শুরু করিয়া যাবতীয় মীনরূপে মজিয়া, মুগ্ধ হইয়া সর্ব কনিষ্ঠ মূল্যের মৎস্য ক্রয় করিয়া মৎস্য শিকার পর্ব সমাপ্ত করি। অতঃপর, আলু,ফুল কপি, সীম ও পালং শাক কিনিবার সময় সদ্যাগত আগ্নিমুল্য লঙ্গাই বেগুনের প্রতি সতৃষ্ণ দৃষ্টিপাত করিয়া, বাজার হইতে নিষ্ক্রান্ত হই। শব্জি বাজারে যাহারা সদ্য পতিত হইতেছে, তাহারা অগ্নিমূল্য এবং স্পর্শ করিলেই হাতে ছ্যাঁকা লাগিতেছে। আমি বুদ্ধিমানের মত, নবাগত কোনও প্রকার শব্জি বা কুলীন মৎস্যকূলের প্রতি হস্ত প্রসারিত না করিয়া, বিক্রেতার কাছে মুল্যমান জানিয়াই, প্রসন্নচিত্তে সত্য যে কঠিন, তাহা উপলব্ধি করিয়া, সহজে গ্রহণ করিবার শিক্ষা দিবার জন্য কবিকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।

    বাজার হইতে ফিরিয়া আরেক প্রস্থ বিশেষ প্রকার লপচু নামক চা সহযোগে দিনলিপি লিখিবার উদযোগ করিতেছিলাম এবং এই সময়ে শ্রীমান সনাতনের  সশব্দে প্রবেশ ঘটিল। তাহার এইরূপ প্রবেশের সবিশেষ কারণ রহিয়াছে। তাহার কন্ঠস্বরটি ঈশ্বর-প্রদত্ত।ইহাকে ব্যারিটোন বলিলে কম বলা হইবে। নীরব নিস্তব্ধ মধ্য নিশীথে, আকাশের দেবতা কোনোরূপ পূর্বাভাস ছাড়াই যেরূপ প্রবল হুঙ্কার ছাড়িয়া, দশদিক প্রকম্পিত করিয়া তোলেন, শ্রীমান সনাতনের ‘বৌদি’ বলিয়া হাঁক পাড়াটা, অনেকটা তদ্রূপ। যে কদাপি শ্রীমান সনাতনের এই হাঁক পাড়া শ্রবণ করে নাই, সে এই কণ্ঠনিনাদের মহিমা উপলব্ধি করিতে পারিবে না। সনাতন আমার সহিত গুফতাগু করিতে আসিলেও, প্রবেশ মুহূর্তে ‘বৌদি’ বলিয়া তাহার বজ্রনিনাদের মধ্যে একটি নিগূঢ় ইঙ্গিত রহিয়াছে। শ্রীমান অতীব চা-রসিক। বস্তুত তাহার সহিত আমার পরিচয় শঙ্করী হোটেলে চায়ের আড্ডায়। শিং ভাঙিয়া বাছুরের দলে ভিড়িতে আমার সহজাত দক্ষতা রহিয়াছে। সনাতনের সঙ্গীবৃন্দের বার্তালাপ শ্রবণ করিয়া বুঝিলাম, ইহারা শিলচরের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে বিচরণ করিয়া থাকে। আমি আবার শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি ঈষৎ অনুরক্ত। আর আমার সঙ্গীবৃন্দ ব্যাঙ্ক ও জীবনে, ডেবিট- ক্রেডিটে সদামগ্ন। অতঃপর, উহাদের টেবিল হইতে উঠিয়া , সনাতনের বন্ধুবৃন্দের টেবিলের পার্শ্ববর্তী টেবিলের একটি চেয়ার দখল করিয়া, উহাদের বিতর্কে নাসিকা প্রবেশ ক্রাইয়া,ক্রমে ভাব জমাইয়া লইলাম। সেই আলাপ হইতে সনাতনের সহিত সম্পর্কটা কীপ্রকারে অন্তরঙ্গতায় রূপান্তরিত হইয়া গেল, তাহা আর স্মরণে আসে না। সম্পর্কের বুনিয়াদ নির্মাণে না লাগে বাস্তুকার, না লাগের স্থপতির আঁকজোঁক;তাই কোনো সম্পর্কের জন্ম মুহূর্তের দিনক্ষণ লিপিবদ্ধ হয় না, শুধু বিচ্ছেদ-বেদনার লগ্নটি চিরস্থায়ী রূপে হৃদয়ে অঙ্কিত রহিয়া যায়। মধ্যাহ্নে শঙ্করী হোটেলে তাহার প্রিয় বয়স্যদের অনুপস্থিতি দেখিলে, সে নির্দ্বিধায় সন্নিকটস্থ আমার ব্যাঙ্কে চলিয়া আসিত। ক্যান্টিনের হারুকে নিজেই চা আনিতে বলিয়া দিত। ইহাতে যে তাহার বিন্দুমাত্র সংকোচ হইত না, তাহা সনাতনের আত্মপর-ভেদাভেদজ্ঞানহীন মনের পরিচয়।  

       সনাতন জানে, আমার গৃহে বিভিন্ন প্রকার চায়ের সংগ্রহ আছে। সুরাপ্রেমীগণ যে প্রকারে ভিন্ন ভিন্ন জাতগোত্রের সুরার সংগ্রহশালা গড়িয়া তুলিতে কার্পণ্য করেন না, আমারও সেই প্রকারের চা-সংগ্রহালয় আছে। সনাতনের বজ্রনিনাদকে তাহার বৌদি উপেক্ষা করিতে পারিলেন না। কিয়ৎক্ষণের মধ্যেই তাহার বৌদি চা ও বিস্কুট সহযোগে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন। গৃহধর্ম পালনে পরাম্মুখ, বাউন্ডুলে প্রকৃতির পুরুষের প্রতি রমণীকূলের হৃদয় সর্বদাই সজল হইয়া থাকে। তাহা না হইলে, দেবদাস যুগাতিক্রমী চরিত্র হইতে পারিত না। তাহাদের চরিত্রের বেহিসাবী সংসারবিমুখতা, এই সকল হিসাবী ও সংসারী চিত্তকে,আপন চরিত্রের অপূর্ণতায়, হয়তো কোনো প্রকারে বিচলিত করিয়া থাকে। মনোবিজ্ঞানীগণই উহা প্রকৃতরূপে বিশ্লেষণ করিতে পারিবেন। আমাদের সনাতনকেও তাহার বৌদি সস্নেহে নানা প্রকার মুখরোচক আহার্য পরিবেশন করিয়া যৎপরোনাস্তি তৃপ্তি লাভ করেন। সনাতনও তাহা আপন অধিকারলব্ধ বিবেচনায় উদরস্ত করিয়া পরিতৃপ্তির উদ্গার তুলিয়া, আমার তাম্রকূটের প্যাকেটের দিকে হস্ত প্রসারিত করে। এই একটি বিষয়ে, আমাদিগের উভয়ের বয়সের তারতম্য কবেই ঘুচিয়া গিয়াছে। কেবল তাহার পূজনীয়া বৌদির আকস্মিক আগমনে, সে জ্বলন্ত, ধুমায়িত শ্বেত দণ্ডটি বিশেষ কৌশলে আড়াল করিতে তাহার দক্ষতায় বিস্মিত হইতে হয়। 

       অতিসম্প্রতি, করোনার অতিমারী চরিত্রে একটা ম্রিয়মান ভাব পরিলক্ষিত হইতেছিল। বহির্গমনে নৈশ-নিশেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হইয়াছে। আবালবৃদ্ধবনিতা মহোৎসাহে সড়কে নির্গত হইতেছে, বিপণীতে, ভোজনালয়ে যাইতেছে। যেন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা দৈবদুর্বিপাকে ভাঙিয়া পড়া বন্দীশালা হইতে মুক্তি পাইয়াছে। কিন্তু অদ্যকার সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার একটি সংবাদ অশনি সংকেত বহিয়া আনিয়াছে। বিজ্ঞানীগণ আফ্রিকায় করোনার একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান মিলিয়াছে। ইহার নামকরণও হইয়া গিয়াছে- ওমিক্রন। সংবাদটি সনাতনের নজর এড়ায় নাই। সনাতনের বিদ্যাশিক্ষা সম্পর্কে কাহারো কোনো প্রকার অবগতি নাই। সনাতন সংবাদ পত্রটি টানিয়া লইয়া কহিল, ভাইরাস যে প্রকারে মিউটেশন করিয়া নিত্য নতুন প্রজাতির জন্ম দিতেছে, লক্ষ করিবেন, রাজনীতিরও মিউটেশন হয়। আমি বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম , ইহা কী প্রকার? সনাতন সোফায় পদযুগল উত্তোলন করিয়া, আসন করিয়া উপবেশ করিল। এইবার গম্ভীর হইয়া কহিল, - দাদা, লক্ষ করিবেন, বিজেপিকে আমরা হিন্দুত্ববাদী কহিয়া থাকি। ইহা সত্য। কিন্তু, কংগ্রেসের স্বর্ণযুগেও হিন্দুত্ব ছিল। রামচন্দ্রকে রাজনীতির অঙ্গনে তো মহাত্মা গান্ধীই আনয়ন করিয়াছিলেন। আর যুদ্ধ জাহাজে নারিকেল ফাটাইয়া, প্রদীপ প্রজ্বলিত করিয়া ইহার যাত্রা শুরু করা তো হিন্দু রীতি। ইহাতে ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রহিল কি ? উহাই রাজনীতির প্রথম করোনা ভাইরাস। ক্রমে তাহা মিউটেশন করিতে করিতে, বর্তমানের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। নির্বাচন আসিলেই, যে কোনো প্রকারে হিন্দুর আবেগ জাগরিত করিতে পারিলেই, সে ভারতীয়ত্বের খোলস ত্যাগ করিয়া, হিন্দুর নামাবলী পরিধান করিয়া, ভোটের বাক্সে প্রবিষ্ট হইয়া পড়ে। রাজনীতিতে মিউটেশনের পলিটিক্স প্রবিষ্ট হইয়া ভারতীয়ত্বের গরিমাকে কেবল দুইটি বিপরীতমুখী ধর্মের পরিচয়ে বিভক্ত করিয়া দিয়াছে।

       সনাতন যাহা বলিল, গণেশের ন্যায় আমি তাহা লিপিবদ্ধ করিলাম মাত্র। অতঃপর, এই বিশ্রম্ভালাপের ন্যূনতম দায়, আপন স্কন্ধে না লইয়া, ঘোষণা করিতেছি ,যে রাজনীতির মিউটেশন সংক্রান্ত বক্তব্য সমূহের সহিত আমার কোনোরূপ সম্পর্ক নাই এবং ইহাকে সনাতন বিশ্বাস কর্তৃক বিরচিত বলিয়া ধরিয়া লইতে হইবে।

স.ব.           

 



Comments

Popular posts from this blog

বিশেষজ্ঞ

দাদার কীর্তি

মাথা