দ্বিতীয় পর্ব
।।২।।
দেওয়ালের ভাষা
দিপু তখন ক্লাস ফোর। নাকি ফাইভ ? ফোরই হবে। ফাইভ থেকে তো হাই স্কুল। সকালের স্কুল। এক সকালে স্কুলে গিয়ে দেখে, স্কুলের সাদা দেওয়ালে, আলকাতরা দিয়ে লেখা, ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ ; এরই পাশে ‘ বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’। সেটা শীতের এক সকাল। সবে নতুন ক্লাস শুরু হয়েছে। শীতের কাচা-মিঠে রোদে , জটলাটা বাড়তে লাগল। রেল কলোনিতে এমনিতেই , হামেশা চোখে পড়ে, দেওয়ালে কত কি লেখা থাকে। দাঁদ-হাজা, নিতাই পিল থেকে শুরু করে, কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ, মজদুর ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলন, বিশাল জনসভা,- রেলওয়ে ইন্সিটিউটের দেওয়ালে, রেলওয়ে কো-অপারেটিভের দেওয়ালে, লোকোশেডের দেওয়ালে, ওয়্যারলেস কলোনির কোয়ার্টারের দেওয়ালে , - কত কি লেখা থাকত। কিন্তু স্কুলের দেওয়ালে , আলকাতরা দিয়ে লেখা, এই দু’টি বাক্য, কি রকম রহস্যময় ঠেকল। বিশেষ করে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’,- এক দুর্বোধ্য রহস্যের ইসারা নিয়ে, সকলের মাথার ঘিলুতে ভেসে রইল। ক্লাস শুরু হবার মুখে স্যার আসছেন, নাম ডাকার খাতা নিয়ে। সবাই ছুটে ছুটে ঢুকে গেল ক্লাসে। স্যার এক মুহূর্ত , থমকে দাঁড়ালেন বন্দুকের নলের সামনে , কিঞ্চিৎ বিমূঢ় দেখালো যেন তাঁকে, হয়তো তিনিও পারেননি এর মর্মোদ্ধার করতে। শ্লথ, মন্থর পদক্ষেপে ঢুকলেন ক্লাসে। নাম ডাকা শুরু করলেন। ইনি সুধীর স্যার। কৃষ্ণকায়, দীর্ঘদেহী, চোখ দু'টো লালচে, যা কালো ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়েও স্পষ্ট দেখা যায়। এক মাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল। ব্যাক ব্রাশ করা। গলার স্বর তীক্ষ্ম , গম্ভীর । ক্লাসে ঢোকা মাত্র, গোটা ক্লাস নিস্তব্ধ। পেছনের বেঞ্চে যারা বসে, তাদের হৃৎপিন্ড থেমে যায়। যে ছাত্রের দিকে তাকান, যেন তার অন্তর পড়ে ফেলতে পারেন, এমন মর্মভেদী দৃষ্টি । সুধীর স্যার ইংরেজি পড়ান। তাও আবার গ্রামার। মুখস্থ বিদ্যার ঘাটতি থাকলে আর দেখতে হতো না। দীপুদের স্কুলের চারপাশে ভেরেন্ডা গাছের ঝোপ ছিল। ক্লাস ক্যাপ্টেনের ডাক পড়ত তখন। একটা যুৎসই , শক্তপোক্ত ডাল ভেঙে আনতে হত তাকে। সেটা আছড়ে পড়ত , কোনো অমনোযোগী ছাত্রের পিঠে, হাতে, ঊরুতে। নীচু ক্লাসে তখনো দীপুরা হাফ প্যান্ট। পায়ে দাগ পড়ে যেত। আর যারা দাগী, একই ক্লাসে দু'বছর ঘষটানো, তারা কাঁদতও না। মার থেকে বাঁচার জন্য , বেঁকেচুরে লাফালাফি করত না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাক্ত,আর শোনা যেত শপাং শপাং শব্দ। তারপর বীরের মত ঘাড় হেলিয়ে, যেন কিছুই হয়নি, তেমন মুখ করে বেঞ্চে বসে পড়ত।
সেদিন সুধীর স্যার , নাম ডাকা শেষ করে, চেয়ারে বসে পড়লেন। উনি সাধারণত গোটা ক্লাসটাই করেন দাঁড়িয়ে। এদিন স্যারের যেন পড়ানোয় মন নেই। বাংলা থেকে ইংরেজিতে কতগুলো ট্রান্সলেশন করতে দিলেন। তারপর মোটা একটা বই খুলে পড়তে লাগলেন। এদিন ক্লাসে মৃদু গুঞ্জনও শোনা যেতে লাগল। তবু যেন স্যারের ভ্রুক্ষেপ নেই। ক্লাস শেষ হবার মিনিট পনেরো আগে খাতা চেয়ে নিলেন। ঢং ঢং করে ক্লাস শেষ হবার ঘণ্টা বাজল। যে খাতা গুলো দেখা বাকী ছিল, সেগুলো নিয়ে গেলেন। ক্লাস ক্যাপ্টেনকে বলে গেলেন, এক ঘণ্টা পর কমন রুম থেকে নিয়ে যেতে। স্যার চলে যাবার পর, ওরা সবাই , আবার দেওয়ালের সামনে জটলা করে দাঁড়ায়। ওরা ভেবে আকুল হয় , বন্দুকের নল কি করে ক্ষমতার উৎস হতে পারে। অসীম ক্লাসে সবচেয়ে ডানপিটে এবং পড়ায়ও ভালো। বরাবর দশের ভিতর থাকে। সে খানিক ভেবে বুঝিয়ে দেয়। পুলিশের কাছে বন্দুক থাকে , দেখেছিস তো ? আর সেজন্যই আমরা পুলিশ দেখলে ডরাই। সেটা তো বন্দুকের জন্যই। একেবারে সহজ অংক। পুলিশের কাছে বন্দুক থাকে বলেই পুলিশের এত ক্ষমতা। আর তাই যাকে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পারে। বাকীরা মেনে নেয়, অসীমের যুক্তি। কিন্ত খটকা থেকে যায়, অন্য বাক্যটা নিয়ে। চীনের নাম ওরা ভূগোলে পড়েছে। কিন্তু ওদের চেয়ারম্যান কি করে আমাদের চেয়ারম্যান হবে? চেয়ারম্যান শব্দটাও নতুন ঠেকছে। প্রেসিডেন্ট শুনেছে। সেবার স্কুলের মেধাবী ছাত্রদের হাতে পুরষ্কার তুলে দিতে , এন.এফ.রেলের জিএম এসেছিলে। হেডমাস্টার জিএম-কে প্রেসিডেন্ট বলছিলেন। ওরা জিএম, ডিআরএম কি জানে। কিন্তু চেয়ারম্যান কি ,ঠিক বোঝেনি। অসীমই বলল, তটিনী স্যারকে জিজ্ঞেস করে নিলেই হবে। ফর্সা, গোলগাল , সদাহাস্যময় তটিনী স্যার ছাত্র মহলে খুব জনপ্রিয়। স্যারের ইংরেজি উচ্চারণ শুনলে মনে হয় সাহেব । ওরা বলত ' পিকুলিয়ার' , স্যার বললেন , ওটা হবে 'পিকিউলিআ' । 'ক'-টা জোর দিয়ে , কিরকম মোচড় দিয়ে বলতেন; শেষের 'আর'-টা উহ্য থাকত। এর পর থেকে পিকু রেডিওতে বিবিসি চালিয়ে , চেষ্টা করেছে পিকিউলিআ শোনার। কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছিল, সাহেবরা শব্দের শেষে 'আর' থাকলে , ওটা উহ্য রাখে। তটিনী স্যার তো ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন, তাই স্যারে ক্লাস মানেই অফুরন্ত গল্পের ভান্ডার। সেদিনই কমনরুমে গিয়ে অসীম, পিকু, দীপুও জুটেছিল শেষে, তটিনী স্যারকে জিজ্ঞেস করে, চেয়ারম্যান মানে কি? স্যার প্রথম একটু অবাক হয়েছিলেন প্রশ্নটা শুনে। পরে বুঝতে পারেন, কোন প্রসঙ্গে এই প্রশ্নটা করা হয়েছে। তটিনী স্যার বললেন, তোমরা সভাপতি যাকে বল, সেটাও চেয়ারম্যান।কমনরুমের কোণায় বসা সুধীর স্যার বলে উঠলেন, তটিনী বাবু, আসলে ওদের চীনে পেয়েছে। সুধীর স্যারকে ওরা আগে খেয়াল করেনি। স্যারের আওয়াজ পেয়ে, তটিনী স্যারকে, আসি স্যার,- বলেই একছুটে বেরিয়ে যায় কমনরুম থেকে। এর কিছুদিন পরই একটা নতুন শব্দ শোনে দীপু। নক্সাল। জিআরপি কলোনির লাল ইটের কোয়ার্টারের দেওয়ালে কালো রঙে লেখা, 'নক্সালবাড়ির লাল আগুন দিকে দিকে ছড়িয়ে দাও'। নীচে ইংরেজিতে লেখা সিপিআই (এমএল)। দীপু সিপিএম জানে। ইলেকশনের সময় নাম শুনেছে। যদিও জেতে অবশ্য কংগ্রেস। ওই সময় মজার মজার গান নিয়ে সিপিএম- এর মিছিল ঘুরত রেল কলোনিতে। দীপুর বাবাও সিপিএমকে ভোট দিতেন। কাস্তে হাতুড়ি চিহ্নটা কলোনির দেওয়ালে দেওয়ালে , আঁকা থাকত। কিছুদিনের মধ্যে সাহেব কলোনির সজল কাকুকে পুলিশ রাতের বেলা ধরে নিয়ে গেল। কাকু তো সিপিএম করে। পিকুর বাবা ডাক্তারী পড়া ছেড়ে ঢুকেছিলেন রেলের চাকরীতে। শুধুমাত্র রেলে সিপিএম-এর সংগঠন করবেন বলে। এটা অনেক পরে জানতে পারে দীপু। দীপুর ভয় হয়, সিপিএম করলে কি পুলিশ ধরে নিয়ে যায়? বাবাও তো সিপিএম । তবে তেমন সক্রিয়ভাবে নয়। বাবা বললেন, সজল কাকু নাকি সিপিএম ছেড়ে নক্সাল হয়ে গিয়েছিলেন। এখন চারদিকেই নক্সালদের পুলিশ ধরছে। সে এক সময় বটে। স্কুলে যেতে আসতে, ওরা এসব নিয়েই গল্প করত। ওদের মধ্যে রতন থাকত সজল কাকুর পরের কোয়ার্টারে। রতন যে কতবার সেই গল্প শুনিয়েছে। গোটা কলোনি জিআরপি, আরপিএফ আর পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। রাত একটা। সজল কাকুর দরজার কড়া নাড়ল পুলিশ। ও নাকি জানালা দিয়ে দেখেছে, হাতকড়া পরা সজল কাকুকে হেঁটে যেতে। অনেক বছর সজল কাকুর চাকরি ছিল না। রেল ইউনিয়ন মাসে মাসে কিছু টাকা দিত ।
কিছুদিনের মধ্যেই এলো , আরো উত্তেজনার দিন। রেডিও তখন সবাই শুনত। ২৫ শে মার্চ পাকিস্তানের সেনারা বহু মানুষকে মেরে ফেলেছে, গুলি করে। বেঁধে গেল ভারতের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধ। সমস্ত গাড়ির হেডলাইটের উপরের অংশে কালো রঙ করা। রেলের লোক এসে সমস্ত কলোনিতে গর্ত করে গেল। বাবা বললেন, একে বলে ট্রেঞ্চ। মাঝেমাঝে সাইরেন বাজত। রেলের এই সাইরেন বদরপুরে বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়। ট্রেন এক্সিডেন্ট হলে বা কদাচিৎ আগুন লাগলে , সাইরেন বাজত। সাইরেন ক'বার বাজল , গুনে বোঝা যায়, মালগাড়ি না প্যাসেঞ্জার ট্রেন এক্সিডেন্ট হয়েছে। তো , রাতে সাইরেন বাজলে আলো নিভিয়ে ফেলতে হত। এরমধ্যে , স্কুলেও ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছে। স্কুলের সমস্ত কাচের দরজা-জানালায় কাগজের টুকরো আড়াআড়ি করে আঠা দিয়ে লাগানো, যাতে বোমা পড়লে কাচ ভেঙে গায়ে না বেঁধে। রাত গভীর হলে শোনা যেত গোলাগুলির শব্দ। মর্টার, স্টেনগান, মেশিনগান শব্দগুলো দীপু জেনে গেল। মাঝেমধ্যে খুব নিচু দিয়ে উড়ে যেত বিমান। তখন সাইরেন বাজত। আর সবাই মাটিতে শুয়ে পড়ত। এগুলো ছিল মহড়া। রেডিওতে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয়তার শিখরে। কমপ্লান না খেয়েও, ডাল-ভাত-মাছ আর কদাচিৎ পাঁঠার মাংস, কে.জি দশ টাকা, খেয়েই দীপু বাড়ছিল। দীপুর পাশের কোয়ার্টারের চন্দু , একসাথেই স্কুলে যেত। স্কুলের বাথরুমে কতগুলো চিহ্ন দেখিয়ে বলেছিল, এগুলো কি জানিস? চন্দু সব জানায়, বোঝায়। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। বৈশাখের আঁচ লাগা রোদ। স্কুলের লাগোয়া শিমুল তুলোর গাছের ছায়ায় বসে, চন্দু খুলে দেয় এক অচেনা-অজানা অন্ধকার জগতের দ্বার। দীপুর নিষ্পাপ সারল্য , সেদিনই হারিয়ে গেল চিরতরে। কো-এডুকেশন স্কুলে আর কোনোদিন সে মেয়েদের দিকে সহজ ভাবে তাকাতে পারেনি। চন্দু একদিন লাল ইটের টুকরো দিয়ে বাথরুমের দেওয়ালে লিখে রাখে 'শিল্পী + রতন' । চন্দু শিল্পীকে চেয়েছিল। কিন্তু পাত্তা পায়নি। চন্দুর বাবা ফিটার। চন্দু ক্লাস ওয়ান থেকেই ফেল করে করে আসছে। চন্দুই একদিন শিল্পীকে দেখায়। দীপু এই প্রথম অন্যরকম চোখে কোনো মেয়েকে দেখে। আর সেই দেখাই, দীপুর মনে , নারীর সৌন্দর্যের একটা চিরস্থায়ী ছবি এঁকে ফেলে।
( ক্রমশ)
Comments
Post a Comment