।। ক্যালাইডোস্কোপ ॥ ধারাবাহিক উপন্যাস
![]() |
।। ক্যালাইডোস্কোপ ।। |
সৌমিত্র বৈশ্য
স্মৃতি
#
স্মৃতি গুলো এভাবেই আসে। সময়ের ক্রোমোজোম নিয়ে, মিশে থাকে আজকের সময়ের সাথে, মনের চিলেঘরে। বিকেল চারটে বাজতে না বাজতে, চলে এলাম মতিলাল-এ। চা ও মিস্টির দোকান। শহরের মধ্যবর্তী হওয়ায় সারাদিন প্রচুর খদ্দের ভিড় করে থাকে। এরা আসে পাশের গাঁ-শহর থেকে। হাট-বাজার সেরে , জিরোয় ফ্যানের হাওয়ায়, চা-সিঙ্গারা খায়। চা পঞ্চাশ পয়সা, সিঙ্গারা এক টাকা, রসগোল্লা দু'টাকা। আরো রকমারি মিষ্টিও আছে। সেগুলো সামান্য দামী । তবে পাঁচ-সাত টাকার চেয়ে বেশী নয় দাম। কেউ চা-সিঙ্গারর অর্ডার দিয়ে দিলে, শেখরদা জিজ্ঞেস করে, চাটনি দেব? কেউ বলে, দাও। কেউ আবার বলে, না, না, চাটনি দিও না। রসগোল্লার সিরা দেও। সিরা মানে রস। রসগোল্লার রসে ভিজিয়ে , চামচ দিয়ে কেটে কেটে খায়। কেউ আবার পুরো সিঙ্গারাটাই চামচ দিয়ে কেটে , সিরা ঢেলে ভিজিয়ে নেয়। এরকম খদ্দের পরে আবার এলে, শেখরদা আলাদা বাটিতে করে সিরা দেয়; যাতে সিঙ্গারাটা কেটে ফেলার পর , পুরো সিরাটা কাটা সিঙ্গারার উপর ঢেলে দিতে পারে। এটা শেখরদার বিশেষ প্রতিভা। শ'য়ে শ'য়ে খরিদ্দার আসে রোজ। তবু , কার কি পছন্দ মনে রাখতে পারে সে। এক মাস, দু'মাস পরে এলেও , মনে থাকে সেই খরিদ্দারের পছন্দটা। পরিমলদা বসেন ক্যাশে। ভীড় বেশী হলে, পরিমলদাও ক্যাশ থেকে উঠে খদ্দেরকে মিষ্টি দেন প্লেটে করে। সব টেবিলে একটা করে জলের জগ থাকে। কোনো টেবিলে স্টিলের, কোনোটায় প্লাস্টিকের জগ। লাল, সাদা, হলুদ, নীল,-- হরেক রঙের জগ। সাদাগুলো বহু ব্যবহারে বিবর্ণ, ধূসর, হলুদ ছোপ লাগা। স্টিলের গ্লাস থাকত জল খাবার জন্য। সেগুলো তেল-তেলে। আমি রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখছি একদিন, এঁটো প্লেট-গ্লাস ডাঁই করে, সাবান গোলা জল ভরা গামলায় ঢেলে দিত। আর একজন, সব প্লেট-গ্লাস ঝুপঝুপ করে গামলার জলে কয়েকবার চুবিয়ে, আরেকটা কলের জলে ধুয়ে, রেখে দিত একটা টেবিলে। দৃশ্যটি দেখার পর, আর গ্লাসে জল খাইনি। সোজা জগ থেকে গলায় উল্টে খেয়ে নিতাম। শেখরদা এটা অপছন্দ করত। বলত, এতে অন্য খরিদ্দারের ঘেন্না করবে। এরপর থেকে আমি সচেতন থাকতাম, শেখরদাকে লুকিয়ে জগ ঢেলে জল খেয়ে নিতাম। শেখরদা আর তার এক ভাই, সুখেন, এক সাথেই কাজ করে এখনে। একেবারে দুপুরে আমি সচরাচর আসি না। এময় আড্ডা দেওয়া যায় না। খদ্দের ভিড় করে থাকে। আর কিছু বন্ধু ইতিমধ্যেই চাকরী পেয়ে গেছে । ওরা আসবে অফিস ফেরত। যেদিন দুপুরে একদম ভাল্লাগেনা, সেদিন চলে যাই মতিলাল। এক কাপ চা, আর অরুণদার দোকান থেকে তিনটে চারমিনার কিনে , হেঁসেল ঘেঁষা , দোকানের শেষ প্রান্তের একেবারে শেষ কোণের শেষ চেয়ারে বসে পড়ি। সাধারণত , ভিড় যতই থাক সহজে কেউ এই টেবিলে বসতে চায় না। হেঁসেলের লাকড়ির ধোঁয়ার গন্ধ আসে। শেখরদা জানে, দেশলাই লাগবে। জর্দার খালি কৌটোয় দেশলাইয়ের বাক্স আর কাঠি থাকে। জর্দার কৌটো বহু ব্যবহারে বিবর্ণ, জং ধরা । সিগারেট ধরিয়ে রিং ছাড়ার চেষ্টা করি। ঠোঁট ছুঁচলো করে, জিবের ডগা দিয়ে ঠেলে দিই। কোনোটা বনবন ফ্যানের হাওয়ায় ভেঙে যায়। আমাদের মধ্যে স্নেহাশিস ছিল রিং মাস্টার। ওর রিং গুলো প্রবল বাতাসেও ভাঙত না। স্নেহাশিস এম এস সি পাশ করেই কাছাড় কলেজে পার্ট টাইম ফিজিক্সের প্রোফেসরের চাকরী পেয়ে গেল। আমাদের মধ্যে প্রথম চাকরী পায় সৌরাংশু। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রোগ্রাম একজিকিউটিভ। ওকে আমরা বলতাম , উত্তম কুমার। হাসিটা হুবহু ভুবন ভোলানো। উত্তম-মার্কা। ধোঁয়া ছাড়ছি, ঘড়ি দেখছি, অধৈর্য হচ্ছি। মতিলালে একটা ব্রিটিশ আমলের রোমান হরফের সংখ্যা দেওয়া ঘড়ি ছিল। হেঁসেলের ধোঁয়া আর প্রেমতলার ধুলোয় ঘড়িটার কাচের কিনার ঘেঁষে বাদামি দাগ পড়ে গেছে। ঘড়ির খাঁচাটা কাঠের। পরিমলদা গর্ব করে বলতেন, ওটা টিক কাঠ। ওনার ঠাকুরদার কেনা। ১৯৪৬ সালে কেনা। ওরা ঘোষ। মিষ্টি বানানো ওদের বংশানুক্রমিক পেশা। ঠাকুরদা নাকি নিজেই বানাতেন মিষ্টি। দেশভাগ হবে হবে করছে। তখন নাকি ঠাকুরদা , দেশ বাড়ির জমিজমা বেচে শিলচর চলে আসেন। সে বছরই, মানে ছেচল্লিশেই দোকানটা বানান। মতিলাল ঘোষ পরিমলদার প্রপিতামহ। প্রথম দিকের সাইন বোর্ডে দোকানের নামের নীচে লেখা থাকত, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক’। সেটা পরে লুপ্ত হয়ে যায়। আসলে পূর্ব পাকিস্থান প্রত্যাগত, দেশছাড়াদের মনে দেশের স্মৃতি, দেশের স্বাদ, দেশের গন্ধ জাগানিয়া, এই বাক্যটি, হয়তো বেদনার্ত, ছলোছলো নস্টালজিয়ার জন্ম দিত। দেশ বলতে, তখনো লোকে সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকা,-- এসবই মনে করত। আমার বাবা এসেছিলেন ১৯৪৮-এ। তখন আর নাকি থাকার মত পরিস্থিতি ছিল না। গ্রামের নাম ছিল ছাতক। আমার ঠাকুমার নাকি আশা ছিল , অচিরেই দুই দেশ এক হয়ে যাবে। চোরাগোপ্তা লুঠতরাজ, ইজ্জত লুট হত। অগ্নিসংযোগ হত। দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের গ্লানি নিয়ে, কোনোক্রমে দিন গুজরান। যে দোকান থেকে মাসের চালডাল, তেল-নুন আসত, দোকানটা কিনে নিল রফিক উদ্দিন। ছোট পিসিমার স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন। কারণ, স্কুলে পড়ানোর মত মাস্টার মশাইরা নেই। ওটা মাদ্রাসা হয়ে গেল। এক বিকেলে নাকি পুকুর ঘাটে , গ্রামেরই জোয়ান ছোকরা , মুসলিম লিগ করা, রহিমুদ্দিন চান করতে নামল। বিধবা ঠাকুমা ফ্যালফ্যাল করে দেখলেন। ঠাকুমার প্রবল শুচিবায়ু ছিল। জল দিয়ে জল ধুতেন বলে, আমরা ছোটবেলা হাসাহাসি করতাম। মুড়ি খেলেও , ঘাটে গিয়ে আচাতে হত। একই পুকুরে দুটো ঘাট। একটা ঠাকুমার, অন্যটা সধবা ছোট পিসির। উনি আমিষ খান। তাই। পুকুর এক, জলও এক। তবু দুই ঘাট। যেন দ্বিজাতিতত্ত্ব ।
‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক’ , --সেই স্মৃতি; বুকের ভিতরকার আকুলি-বিকুলি বেদনার সজল উপশম । আর কি করে যেন একটা পংক্তি উড়ে এল। পকেট হাতড়ে পেলাম না কাগজের টুকরো। অগত্যা, অরুণদা-শরণং । দু’তিনটে সিগারেটের খালি প্যাকেট ছিঁড়ে, কবিতার পংক্তিগুলো লিখে ফেলি। মাথার ভিতরে এরা মেঘ হয়ে জমে থাকে। পরপর কিছু লাইন এসে যায়। আবার থেমে যায়। প্রগতিবাদী নই। সামাজিক দায়বোধ থেকে লিখি না কবিতা, কিছু বন্ধুর মত। আবার সমাজের অন্যায়ও মেনে নিতে পারিনা। বামপন্থী রাজনীতি সমর্থন করি। বামপন্থীদের মন থেকে ভালোবাসি। কিন্তু কবিতা লিখি যখন, তাতে সমাজ-টমাজ থাকে না তাতে। আর্তের হাহাকারও নয়। পূর্ণিমার চাঁদকে, পূর্ণিমার চাঁদই মনে হয়। ঝলসানো রুটির মত মনে তো হয় নি। বরং গান্ধী বাগের সাপনালার জলে চাঁদের ছায়া দেখে, মন গুণগুণ করেছে, মান্না দে; ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে। মঞ্জু খুব ভালো গান গায়। চারমিনার থেকে তামাক বের করতে করতে সে গাইত। জ্যোতিদা ততক্ষণে গাঁজা ডলে ফেলেছে। সিগারেটের সরু মুখ দিয়ে গাঁজা পোরা বেশ কঠিন কাজ। জ্যোতিদা আমাদের থেকে বয়সে সামান্য বড়। ডাক্তারি পড়ে। মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে সুলভে গাঁজা পাওয়া যায়। সে-ই আনত। গান্ধিবাগের বেনহে বসে, চাঁদের আলোয়, গান থেকে গানে, কবিতা থেকে কবিতায়, ভাসতে ভাসতে, মেঘ হয়ে, বিনয় মজুমদার হয়ে, জীবনানন্দ হয়ে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় হয়ে, আমাকে তুই আনলি কেন ? ফিরিয়ে নে। আশ্বিন-শেষের ঘাস ভিজে উঠত , আবছা শিশিরে। শিশিরে ভেজা ঘাস মাড়িয়ে বাড়ি ফিরছি। টিমটিমে রিক্সার আলোয় ও কার মুখ দেখলাম ? স্বাতী কি ? ডেকে উঠতে গিয়েও , ডাকা হল না। এলাইড এজেন্সির সামনের মোড় ঘুরে, দ্রুত চলে গেল রিক্সা। এখান থেকে ডাক দিলে, সে ডাক কখনোই স্বাতীর কানে পৌঁছবে না। আমার ডাক কখনো কি পৌঁছবে স্স্বাতীর কানে ?স্ব

Comments
Post a Comment