কূটকচালি সনাতন বিশ্বাস উবাচ
পাঁচমিশালী
কার্তিক বিদায় লইল। শৈশব কালে ঋতু পরিবর্তনের আভাস পাইতাম। গ্রীষ্ম হইতে বর্ষা আসিলে, পাঠশালা হইতে ফিরিবার সময়, তুমুল বৃষ্টিতে ভিজিয়া, সর্দি কাশি হইলে, পাড়ার হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার দাদু, সাদা কাগজে পাউডার মুড়িয়া, ফাউন্টেন পেনে নীল কালিতে লিখিয়া দিতেন,'দৈনিক দুই মাত্রা'। সঙ্গে ডাক্তার দাদু ইহাও স্মরণ করাইয়া দিতেন,--'সিজন চেঞ্জ হইতেছে, ঋতু পরিবর্তনের সাবধানে থাকিতে হয়'। ডাক্তার দাদুর এই 'দৈনিক দুই মাত্রা',অতি সুস্বাদু। তবে দুই দিন ক্লাস কামাই দিয়া, নানা প্রকার সুখাদ্য ও লেখাপড়া হইতে অব্যাহতি পাইয়া, সুস্থ হইয়া পুনর্বার পাঠশালা অভিমুখে যাত্রা করিতে হইত। আশ্বিনের মধ্যভাগেই শিশির পড়িত। শেফালি ফুটিত। সন্ধ্যা কালে শিউলি ফুটিলে, সুগন্ধ মলয় বাতাসে বাহিত হইয়া, ঘ্রাণেন্দ্রিয় মথিত করিত। আমরা বুঝিতাম, পূজা আসন্ন। আশ্বিনেই রৌদ্র সোনালী বর্ণ ধারন করিত। সূর্যদেব তাঁহার উত্তাপ স্তিমিত করিয়া, সমস্ত চরাচর জুড়িয়া মায়ালোক রচনা করিতেন। মহালয়া হইতে পাঠশালা ছুটি হইত। আমাদিগের ন্যায় বালকগণের সকল স্ফূর্তি, সকল গার্হস্থ্য অনুশাসনের তোয়াক্কা না করিয়া, মাঠে-ঘাটে নানা প্রকার ক্রীড়ায় উন্মত্ত হইয়া উঠিত। যাহারা আমার ন্যয় সুশীল ছিল না, যাহারা খালে-বিলে-পুকুরে দাপাইত, তাহাদের কেহ কেহ অচিরেই সর্দি কাশিতে আক্রান্ত হইত। ডাক্তার দাদু চিরপরিচিত সাবধান-বাণী শুনাইতেন,-- 'ঋতু পরিবর্তনের সময় সাবধানে থাকিতে হয়'। সেই ডাক্তার দাদুও বহুকাল হইল, ধরা হইতে বিদায় লইয়াছেন। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারগণও এখন আর সাদা কাগজে সুস্বাদু পাউডার দিয়া , 'দৈনিক এক মাত্রা',-লিখিয়া দেন না; তাঁহারা বর্তমানে বহুমূল্য ফাইল ও নানা প্রকার শিশিতে তরল ঔষধ দিয়া থাকেন, কেহ বা স্টেথো দিয়া বক্ষ পরীক্ষা করেন, এক্স-রে ইত্যাদিও করাইয়া থাকেন। ইহারা কলেজ পাশ দেওয়া ডাক্তার বাবু।
যাহা হউক, বলিতেছিলাম যে অগ্রহায়ণে ফ্যান চলিলেও স্বস্তি বোধ হইতেছে। গৃহস্থগণ এখনও তোরঙ্গ হইতে লেপ বাহির করিয়া, রৌদ্রে শুকাইতে দেন নাই। ধুনকরবৃন্দ ইতিউতি ঘুরিতেছে। কিন্ত গৃহস্থ কুটির ( কুটির কোথা ? সকলই ফ্ল্যাট হইয়া গিয়াছে) হইতে, ইহাদের ডাক পরিতেছে না। বাজারে নানা প্রকার শাক উঠিয়াছে। মূলা নির্গত হইয়াছে। যদিও মূলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি বর্তমানে সম্বৎসর বাজার আলো করিয়া থাকে। এই সকল দেখিলে বোধ হয় যে শীতকাল সমাগত। কিন্তু প্রকৃতির বহিরঙ্গে তাহার কোনোরূপ প্রকাশ নাই। হইতে পারে পঙ্গপালের সহিত পাল্লা দিয়া মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি হইতেছে। কিন্তু প্রকৃতি এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আবাস নির্মাণের সংস্থান রাখে নাই বলিয়া, মানুষ প্রকৃতি উজাড় করিয়া , আপন বাহুবলে বাসস্থান নির্মাণ করিতেছে। আর প্রকৃতি মানব প্রজাতিকে যে পরিমান মেধা-বুদ্ধি এবং দুর্বুদ্ধি প্রদান করিয়াছেন, তাহার সিকি শতাংশ বিভিন্ন মনুষ্যেতর প্রাণীকুলকে প্রদান করিলে, তাহারাও সম্মুখ সমরে দন্ডায়মান হইয়া কহিতে পারিত,--'বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচ্যগ্র মেদিনী'। সে যাহা হউক, অগ্রহায়ণের দ্বিতীয় দিবসে, ঘর্মাক্ত পৃষ্ঠদেশ ও গোলাকৃতি এবং ক্রমবর্ধমান উদরখানি লইয়া , প্রাণান্ত হইয়া বাজার হইতে পদব্রজে গৃহে ফিরিলাম। দুই হস্তে দুইখানি বিশাল থলি। গৃহকত্রী এক্ষণে আমার স্বাস্থ্য নিয়ামক হইয়াছেন। রক্তে শর্করা আবিষ্কৃত হইবার পর, স্বাস্থ্যরক্ষার নানা বিধি তিনি ফেসবুক নামক সবজান্তাটি হইতে ( পাঠক, লক্ষ করিবেন , ফেসবুকে সকলেই সবকিছু জানে; পরে সময়ান্তরে ইহা লইয়া গুলজার করা যাইবে না হয়), নানা তথ্য সংগ্রহপূর্বক আমার খাদ্য তালিকায় সংযোজিত করিতেছেন। আর পদব্রজে প্রত্যহ দুই-দুই চারি কিলোমিটার বাজার করিতে যাওয়ার কারণ, গৃহকত্রী জ্ঞাত হইয়াছেন, হাঁটিলে রক্তের শর্করা যেমন হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, তেমনি উদরের আয়তন চুপসাইয়া যাইবে।
এইবার আমি চা সহযোগে দিনলিপি লিখিব। কী লিখি তাহা জানে না। যখন যাহে মনে আসে, তাহা লিখি। আমার মুদ্রিত হরফে আত্মপ্রকাশের উদগ্র বাসনা নাই। ফলে মনের আনন্দে যাহা মনে আসে, তাহা লিখিয়া রাখি। বিগত কয়েকদিন সনাতন আসে নাই। সংসারে একা মানুষ সে। হয়তো সময় কাটাইবার নতুন কোনো ঠেক পাঠাইয়াছে। বিবাহের উদ্বন্ধনে সে বাঁধা পড়ে নাই। বিবাহকুঞ্জে যে মালা বদল হয়, ইহা যে কী পরিমাণ প্রতীকী ব্যঞ্জনা বহন করে, তাহা বিবাহোত্তর জীবনে উপলব্ধি করা যায়। আমার মধ্যে হয়তো কোনোপ্রকার দৈবশক্তি জাগ্রত হইতেছে; সনাতনের কথা ভাবিতেই সে সশব্দে হাজির হইল। সে একটি শ্যামাসংগীত গাহিতে গাহিতে, আমার বসিবার কক্ষে প্রবেশ করিল। সে গাহিতেছে,--'দোষ কারো নয় গো মা…'। অকারণে গান গাহিবার ব্যক্তি সে নহে। বুঝিলাম, সে হয়তো আমাদের সামাজিক নিষ্ক্রিয়তাকে বিদ্রূপ করিতেছে। তাহার কন্ঠে সুর নাই, এমন অপবাদ কেহ দিবে না। তাহার গান সমাপ্ত হইল, গৃহকত্রীর আগমনে। তিনি কহিলেন,—'থামিলে কেন? চমৎকার গাহিতেছিলে'। সে কহিল,–'গলা শুকাইয়া গিয়াছে। ইহাকে সিক্ত করিবার বন্দোবস্ত হউক'। মুচকি হাসিয়া গৃহকত্রী আঁচলে হাত মুছিয়া গমন করিলেন। আমি কহিলাম,—'আর কিবা সংবাদ,সনাতন?'
সে কোনো উত্তর না দিয়া, পুনর্বার গুনগুন করিয়া সু্র ভাঁজিতে লাগিল। আমিও প্রত্যুত্তরের আশায়, ডায়েরি ও কলম বন্ধ করিলাম। সে এক দৃষ্টিতে ছাদের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকাইয়া গুনগুন করিতেছে এবং পা দুলাইতেছে। আচমকা সুর ভাঁজা থামাইয়া, আপন ঊরুদেশে প্রবল চপেটাঘাত করিয়া কহিল,--'দেশের চেয়ে মামা বড় নহে'। বুঝিলাম কোন প্রসঙ্গের অবতারণা হইতে যাইতেছে। লাচিত বরফুকনের চারিশততম জন্ম বার্ষিকী মহাসমারোহে পালিত হইতেছে। স্মরণে পড়িল, বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে আমরা লাচিত বরফুকন সম্পর্কে পড়িয়াছিলাম। শরাইঘাটের যুদ্ধ , মোমাইকাটা গড়, কর্তব্যে গাফিলতির জন্য মাতুলকে হত্যা করা,-- এইসকল কাহিনী জানিতাম। লাচিত একজন বীর যোদ্ধা ছিলেন। তাঁহাকে লইয়া, তাঁহার জন্মের চারিশত বৎসর উদযাপনে যে মহাসমারোহ হইবে, তাহা বিচিত্র কী ! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চারিশত বৎসর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বাঙালী কি কম ঢক্কানিনাদ করিবে? অবশ্য তাহা সনাতন বা আমি, কেহই দেখিব না। সনাতন কহিল যে সকলই পলিটিক্স । রাজনীতিতে পলিটিক্স ঢুকিয়া যাওয়া সনাতনের একটি প্রিয় লব্জ। রাজনীতিটি তাহার কাছে আদর্শমন্ডিত। কিন্তু পলিটিক্স সংকীর্ণ কোন্দলের সমার্থক । সে প্রায়শঃ বলিয়া থাকে , বাঙালীর সবকিছুতেই পলিটিক্স । এইবার সে ঝাড়িয়া কাশিল। লাচিত পরাক্রান্ত মোগলগণকে প্রতিহত করিয়াছিলেন। মোগলরা এই দেশ শাসন করিলেও, তাহারা বিধর্মী। বর্তমান হিন্দুত্বের আবহ, লাচিতের বীরগাথা তুলিয়া ধরিবার প্রকৃত সময়। শিবাজীর সহিত একই সঙ্গে লাচিতের নামও উচ্চারিত হইবে। সেই জন্য দিল্লীতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মুখ্য অনুষ্ঠানের সূচনা করিবেন। ফলে লাচিত, আঞ্চলিকতার গন্ডি অতিক্রম করিয়া, জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করিবেন। অপরদিকে , নাগরিকত্ব বিল, আসাম চুক্তি রূপায়ন, নাগরিক পঞ্জী ইত্যাদি লইয়া , জাতীয়তাবাদী হৃদয়ে যে ক্ষোভ ও ক্ষত জন্মিয়াছে, তাহাতে মলম পড়িবে।
এইসকল শ্রবণ করিয়া সনাতনের চিন্তা শক্তির উর্বরতার প্রমাণ পাইলাম। চা ও ডালমুট সহয়েগে ১৮ নভেম্বরের ধর্মঘট সম্পর্কেও একটি সন্দর্ভ পেশ করিল। সে নিশ্চিত যে বামপন্থী এবং অ-বিজেপি দলগুলি এই মুহুর্তে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন। তবে মানুষ যে ক্ষুব্ধ, তাহা এই ধর্মঘটে সোচ্চারে ঘোষিত হইত। দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের সময় আসিয়া পড়িল। গৃহকত্রী সনাতনকে ভোজনের অনুরোধ করিতেই সে একবাক্যে রাজী হইয়া গেল।
Comments
Post a Comment