বহুরূপে সম্মুখে তোমার রবীন্দ্র ঠাকুর
চৈত্র ক্যালেন্ডার ও পঞ্জিকা হইতে বিদায় লইয়াছে। বাঙালী কাহারা,-- ইহাও নাকি একপ্রকার ধাঁধা বিশেষ,- সনাতন এমত একটি সন্দর্ভ একদা জ্ঞাপন করিয়াছিল। ইহা লইয়া যথা সময়ে, আবকাশ মত বিস্তারিত বলিব। ‘এসো হে বৈশাখ' , গাহিয়া বৈশাখকে আবাহন করিল। স্মরণে আছে, ১৪০০ সালের আবির্ভাব লগ্নটিকে স্মরণীয় করিয়া রাখিতে, আপামর বাঙালী কী প্রকারে ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছিল। শিলচর শহরেও তাহার ব্যত্যয় হয় নাই। নৃত্য-বাদ্য-গীত ও আবৃত্তি সহযোগে, শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ে একটি মহা আয়োজিত হইয়াছিল। তখন নৃত্যগুরু মুকুন্দ ভট্টাচার্য জীবিত ছিলেন। মধ্যাহ্ন কালে আয়োজিত সেই মহতী আনন্দযজ্ঞে, ঔৎসুক্য বশতঃ , আমিও সামিল হইয়াছিলাম। একাধারে পয়লা বৈশাখ, তদুপরি নবাগত ১৪০০ সালের আবাহনে, নৃত্য-বাদ্য-গীত ও আবৃত্তির এহেন আয়োজনে উপস্থিত হইবার লোভ সম্বরণ করিতে পারি নাই। হলুদ পাঞ্জাবী ও শাদা পায়জামা পরিধান করিয়া উপস্থিত হইলাম। শহরের সকল সম্ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি পিপাসুগণ উপস্থিত হইয়াছেন এবং আমি 'হংস মধ্যে বক যথা' হইয়া, পরিচিত কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির সহিত অকস্মাৎ দৃষ্টি বিনময় হইলে, মৃদু হাস্য সহযোগে মস্তিষ্ক হেলাইয়া নীরবে কুশল বিনিময় করিলাম। তৎসঙ্গে পুলকিত বোধও করিলাম, বিশিষ্ট জনটি আমা হেন ব্যক্তিকে চিনিতে পারিয়াছেন। বস্তুত , আমার নেশাগত কারণে যা়ঁহাদের চিনি, তাঁহারা আমার পেশাগত জগতে আসিলে, তাঁহাদের সেবা বা পরিষেবা, অতিতৎপর হইয়া করিয়া থাকি। ইহাতে তাঁহারা প্রভূত প্রসন্ন হইয়া থাকেন এবং তাঁহারা এইরূপ বিশ্বাস অন্তরে লালন করেন, যে এমত সেবা কিম্বা পরিষেবা তাঁহাদের মেধাসিদ্ধ সামাজিক অধিকার। কারণ, তাঁহারা সমাজের ক্ষীর। সংস্কৃতির আঙিনা হইতে তাঁহারা সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ প্রদান করিয়া থাকেন। মধ্যাহ্নের শেষ পর্বে হৃষ্ট চিত্তে গৃহে প্রবেশ করিয়া, গৃহসঞ্চালিকার যেরূপ তীব্র ভর্ৎসনার সম্মুখে পড়িয়াছিলাম, তাহা 'বারোইয়া-তেরোইয়া'-রূপী কালবৈশাখীর তান্ডব হইতে কম নহে। আর আমার হৃদয়ে রবি ঠাকুর গাহিতেছিলেন,'আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড ডম্বরু বাজিল গম্ভীর গরজনে'...। পয়লা বৈশাখের মধ্যাহ্ন ভোজন তাঁহার হয় নাই। কারণ, বিশেষ দিবসটিতে পতির ভোজন না হইলে তিনি ভোজন করিবেন না, ইহাই তাঁহার পণ। অতঃপর হস্ত প্রক্ষালন পূর্বক দ্রুত ভোজনে উপবিষ্ট হইলাম। তাঁহার এই গর্জনের অন্তরালে যে একটি সজল ভালোবাসা লুক্কায়িত রহিয়াছে, তাহা উপলব্ধির অনধিগম্য নহে। প্রৌঢ়ত্বের দাম্পত্য জীবন হোমাগ্নির ন্যায় দাহ্য নহে; বরঞ্চ শীতকালের কন্থার মৃদু উষ্ণতার অনুভূতির ন্যায় আচ্ছাদিত করিয়া রাখে। বৈশাখের প্রারম্ভেই এহেন নিদাঘে, দেহ-চর্মে সুখ নাই; যেন কেহ তপ্ত ঝামা ঘষিয়া দিতেছে। আমাদিগের শৈশব-কৈশোর গ্রীষ্মের সূচনাপর্বের উত্তাপ দিব্যি সহনশীল বোধ হইত। তখন বিদ্যুত্ চালিত পাখার বহুল প্রচলন ছিল না। তালপাতার পাখা স্বহস্তে নাড়িলেই, আরাম বোধ হইত। কিন্তু বর্তমানে বৈদ্যুতিক পাখার প্রবল ঘূর্ণনেও, হাওয়ার তপ্ত ঝাঁঝ কিছুমাত্র লঘু হইতেছে না। পরিবেশও বোধহয় আমাদের সমাজ মানসিকতার অনুসারী। দেখিতে দেখিতে চারিপার্শ্বের সমাজটিও কীরকম উগ্র, ঝাঁঝালো হইয়া উঠিল। ঘর্মাক্ত কলেবরে বাজার হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া, এক কাপ চায়ের প্রত্যাশায় বসিয়া আছি। অদ্য কি আর সনাতনের আগমন ঘটিবে না। সে আমার সকালের বিশ্রম্ভালাপের অভ্যাসের অংশীদার হইয়া পড়িয়াছে। একদা 'মহিমালয়' আমাদিগের রবিবাসরীয় কালক্ষয়ের একটি আকর্ষণীয় রত্নখচিত আস্তানা ছিল। ইহার মধ্যমণি ছিলেন শক্তিপদ ব্রহ্মচারী। আমরা গুটি কতক বন্ধু মিলিয়া, এক পার্শ্বের বেঞ্চিতে উপবিষ্ট হইয়া, সাহিত্যালাপ নহে, তাঁহাদের রাজনৈতিক বিতন্ডা উপভোগ করিতাম। এক পক্ষে সিপিএম-পন্থী এবং অপর পক্ষে সিপিএম-বিরোধী একটি গোষ্ঠীর মধ্যেই রাজনৈতিক তরজার উত্তাপে মহিমালয় লোকসভার ক্ষুদ্র সংষ্করণে পরিণত হইত। সিপিএম-পন্থীগনের মধ্যে অকাল প্রয়াত চিত্ত দেবরায়কে বিরোধী শিবির এবম্প্রকারে উত্তেজিত করিয়া দিতেন, যে তিনি ক্ষিপ্ত হইয়া সদন ত্যাগের ন্যায়, প্রখর রৌদ্রতাপ মস্তকে ধারণপূর্বক, মহিমালয়ের সম্মুখস্থ ফুটপাথে দন্ডায়মান হইয়া থাকিতেন। কিন্তু কানু বিনে যেপ্রকারে গীত হয় না, তেমনি চিত্ত দেবরায় ব্যতীত এই তরজা-বিতন্ডা যে জমিবে না, তাহা উপস্থিত সকলেই বিলক্ষণ জ্ঞাত ছিলেন। ইহার পর সমবের সাধ্য-সাধনা ও চা-বিস্কুট সহযোগে আপ্যায়িত করিয়া চিত্ত বাবুকে, ফুটপাথ হইতে মহিমালয়ের অভ্যন্তরে পুনঃস্থাপিত করিয়া, দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হইত। ছাদে ঘুরন্ত ফ্যানখানার ঘূর্ণন দেখিতে দেখিতে, এই সকল সাত-পাঁচ স্মৃতিচারণ করিতেছি, এমন সময় 'আজি দখিন দুয়ার খোলা' , গাহিয়া সনাতনের প্রবেশ ঘটিল এবং যথারীতি 'বৌদি' বলিয়া হাঁক পাড়িল। এই খর গ্রীষ্মে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, তখন ঘর্মাক্ত কলেবরে কেহ, বসন্তের গান গাহিতে পারে, তাহা আমার কল্পনাতীত। সনাতন ঘর্মাক্ত কলেবরে সোফায় চিৎ হইয়া, ধুলি ধূসরিত পদযুগল তুলিয়া দিল।আমি মনে মনে প্রমাদ গুণিলাম। তাহার বৌদি যথেষ্ট স্নেহপরায়না হইলেও, সনাতনের কতিপয় আচরণে তিনি বিরক্তি বোধ করিয়া থাকেন; তন্মধ্যে চায়ের কাপে সিগারেট নিরঞ্জন ও শহর চষিয়া আসিয়া ধূসরিত পদযুগল সোফায় তুলিয়া দেওয়া, তাহার প্রিয় বৌদির একেবারেই মনঃপূত নহে। তবে বৌদি তাহাকে অনাদর করেন নাই। তরমুজ কর্তন করিয়া , এক প্লেট তরমুজ ও কাজু বাদাম পরিবেশন করিলেন। তাহার পর বিস্কুট ও চা আসিল। তরমুজ ভক্ষণ করিতে করিতে, সনাতন জিজ্ঞাসা করিল, বর্তমানে যে সকল রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠিত হয়, তাহা সম্পর্কে আপনার কী অভিমত? আমি কহিলাম, ইহা সম্পর্কে আমার কোনোরূপ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নাই। ফলে, কোনোরূপ মতামত প্রদান করা আমার পক্ষে সমিচীন নহে। এক কালে কেন্দ্রীয় ভাবে কবিপক্ষ অনুষ্ঠিত হইত। তখন গ্রন্থাগারের জনাকীর্ণ প্রেক্ষাগৃহে উপভোগ্য অনুষ্ঠান হইত। সনাতন তির্যক হাসিয়া কহিল, বর্তমানে ইহা শেষ পাইয়াছে। এই কালে যাহারা সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করিয়া থাকেন, তাহারা সকলে আপন আখড়ায় , স্বতন্ত্র ভাবে রবীন্দ্র চর্চা করিয়া থাকেন। এই প্রকারের কয়েটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হইবার সুযোগ ঘটিয়া ছিল। জিজ্ঞাসা করিলাম, কেমন লাগিল ? সে সহাস্যে কহিল, বুঝিলাম রবীন্দ্রনাথ একজন নহেন। অধ্যাপক-গবেষকের রবীন্দ্রনাথ একরকম। সেই সকল রবীন্দ্রনাথের কেহ বা হিন্দুত্ববাদী, কেহ জাতীয়তাবাদী, কেহ সংশয়বাদী, কেহ কামুক ও প্রায় লম্পট। বিভিন্ন ক্ষুদ্র সাহিত্য গোষ্ঠীর রবীন্দ্রনাথ আরেক রকম। বিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ আরেক রকম। কিন্তু যে রবীন্দ্রনাথ প্রাণের আরাম, যে রবীন্দ্রনাথ মনের আনন্দ,যে রবীন্দ্রনাথ আত্মার শান্তি, তাঁহাকে পাই নাই। রবীন্দ্রনাথকে উপলক্ষ করিয়া, সকলে আপনাকে প্রকাশ করিতে, আপনাকে গৌরবে মহিমান্বিত করিতে বড়ই ব্যগ্র। অথচ আমরা যখন কণিকা-সুচিত্রা-দেবব্রতর সঙ্গীত শ্রবণ করি, তখন তাঁহাদের গানের ভিতর দিয়া আমরা রবীন্দ্রনাথের অন্তরলোকে মিলিয়া যাই। কিন্তু রবীন্দ্র জয়ন্তীর উদযাপনে,আপন মনের মাপ ও মতলব অনুসারে রবীন্দ্রনাথকে ছাঁটিয়া প্রকাশ করিতেছেন। ফলতঃ একটিই বিশ্বাসে উপনীত হইয়াছি, বহুরূপে সম্মুখে তোমার রবীন্দ্র ঠাকুর।
Comments
Post a Comment