।। ক্যালাইডোস্কোপ ।।
সৌমিত্র বৈশ্য
স্মৃতি
#
স্মৃতি গুলো এভাবেই আসে। সময়ের ক্রোমোজোম নিয়ে, মিশে থাকে আজকের সময়ের সাথে, মনের চিলেঘরে। বিকেল চারটে বাজতে না বাজতে, চলে এলাম মতিলাল-এ। চা ও মিস্টির দোকান। শহরের মধ্যবর্তী হওয়ায় সারাদিন প্রচুর খদ্দের ভিড় করে থাকে। এরা আসে পাশের গাঁ-শহর থেকে। হাট-বাজার সেরে , জিরোয় ফ্যানের হাওয়ায়, চা-সিঙ্গারা খায়। চা পঞ্চাশ পয়সা, সিঙ্গারা এক টাকা, রসগোল্লা দু'টাকা। আরো রকমারি মিষ্টিও আছে। সেগুলো সামান্য দামী । তবে পাঁচ-সাত টাকার চেয়ে বেশী নয় দাম। কেউ চা-সিঙ্গারর অর্ডার দিয়ে দিলে, শেখরদা জিজ্ঞেস করে, চাটনি দেব? কেউ বলে, দাও। কেউ আবার বলে, না, না, চাটনি দিও না। রসগোল্লার সিরা দেও। সিরা মানে রস। রসগোল্লার রসে ভিজিয়ে , চামচ দিয়ে কেটে কেটে খায়। কেউ আবার পুরো সিঙ্গারাটাই চামচ দিয়ে কেটে , সিরা ঢেলে ভিজিয়ে নেয়। এরকম খদ্দের পরে আবার এলে, শেখরদা আলাদা বাটিতে করে সিরা দেয়; যাতে সিঙ্গারাটা কেটে ফেলার পর , পুরো সিরাটা কাটা সিঙ্গারার উপর ঢেলে দিতে পারে। এটা শেখরদার বিশেষ প্রতিভা। শ'য়ে শ'য়ে খরিদ্দার আসে রোজ। তবু , কার কি পছন্দ মনে রাখতে পারে সে। এক মাস, দু'মাস পরে এলেও , মনে থাকে সেই খরিদ্দারের পছন্দটা। পরিমলদা বসেন ক্যাশে। ভীড় বেশী হলে, পরিমলদাও ক্যাশ থেকে উঠে খদ্দেরকে মিষ্টি দেন প্লেটে করে। সব টেবিলে একটা করে জলের জগ থাকে। কোনো টেবিলে স্টিলের, কোনোটায় প্লাস্টিকের জগ। লাল, সাদা, হলুদ, নীল,-- হরেক রঙের জগ। সাদাগুলো বহু ব্যবহারে বিবর্ণ, ধূসর, হলুদ ছোপ লাগা। স্টিলের গ্লাস থাকত জল খাবার জন্য। সেগুলো তেল-তেলে। আমি রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখছি একদিন, এঁটো প্লেট-গ্লাস ডাঁই করে, সাবান গোলা জল ভরা গামলায় ঢেলে দিত। আর একজন, সব প্লেট-গ্লাস ঝুপঝুপ করে গামলার জলে কয়েকবার চুবিয়ে, আরেকটা কলের জলে ধুয়ে, রেখে দিত একটা টেবিলে। দৃশ্যটি দেখার পর, আর গ্লাসে জল খাইনি। সোজা জগ থেকে গলায় উল্টে খেয়ে নিতাম। শেখরদা এটা অপছন্দ করত। বলত, এতে অন্য খরিদ্দারের ঘেন্না করবে। এরপর থেকে আমি সচেতন থাকতাম, শেখরদাকে লুকিয়ে জগ ঢেলে জল খেয়ে নিতাম। শেখরদা আর তার এক ভাই, সুখেন, এক সাথেই কাজ করে এখনে। একেবারে দুপুরে আমি সচরাচর আসি না। এময় আড্ডা দেওয়া যায় না। খদ্দের ভিড় করে থাকে। আর কিছু বন্ধু ইতিমধ্যেই চাকরী পেয়ে গেছে । ওরা আসবে অফিস ফেরত। যেদিন দুপুরে একদম ভাল্লাগেনা, সেদিন চলে যাই মতিলাল। এক কাপ চা, আর অরুণদার দোকান থেকে তিনটে চারমিনার কিনে , হেঁসেল ঘেঁষা , দোকানের শেষ প্রান্তের একেবারে শেষ কোণের শেষ চেয়ারে বসে পড়ি। সাধারণত , ভিড় যতই থাক সহজে কেউ এই টেবিলে বসতে চায় না। হেঁসেলের লাকড়ির ধোঁয়ার গন্ধ আসে। শেখরদা জানে, দেশলাই লাগবে। জর্দার খালি কৌটোয় দেশলাইয়ের বাক্স আর কাঠি থাকে। জর্দার কৌটো বহু ব্যবহারে বিবর্ণ, জং ধরা । সিগারেট ধরিয়ে রিং ছাড়ার চেষ্টা করি। ঠোঁট ছুঁচলো করে, জিবের ডগা দিয়ে ঠেলে দিই। কোনোটা বনবন ফ্যানের হাওয়ায় ভেঙে যায়। আমাদের মধ্যে স্নেহাশিস ছিল রিং মাস্টার। ওর রিং গুলো প্রবল বাতাসেও ভাঙত না। স্নেহাশিস এম এস সি পাশ করেই কাছাড় কলেজে পার্ট টাইম ফিজিক্সের প্রোফেসরের চাকরী পেয়ে গেল। আমাদের মধ্যে প্রথম চাকরী পায় সৌরাংশু। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রোগ্রাম একজিকিউটিভ। ওকে আমরা বলতাম , উত্তম কুমার। হাসিটা হুবহু ভুবন ভোলানো। উত্তম-মার্কা। ধোঁয়া ছাড়ছি, ঘড়ি দেখছি, অধৈর্য হচ্ছি। মতিলালে একটা ব্রিটিশ আমলের রোমান হরফের সংখ্যা দেওয়া ঘড়ি ছিল। হেঁসেলের ধোঁয়া আর প্রেমতলার ধুলোয় ঘড়িটার কাচের কিনার ঘেঁষে বাদামি দাগ পড়ে গেছে। ঘড়ির খাঁচাটা কাঠের। পরিমলদা গর্ব করে বলতেন, ওটা টিক কাঠ। ওনার ঠাকুরদার কেনা। ১৯৪৬ সালে কেনা। ওরা ঘোষ। মিষ্টি বানানো ওদের বংশানুক্রমিক পেশা। ঠাকুরদা নাকি নিজেই বানাতেন মিষ্টি। দেশভাগ হবে হবে করছে। তখন নাকি ঠাকুরদা , দেশ বাড়ির জমিজমা বেচে শিলচর চলে আসেন। সে বছরই, মানে ছেচল্লিশেই দোকানটা বানান। মতিলাল ঘোষ পরিমলদার প্রপিতামহ। প্রথম দিকের সাইন বোর্ডে দোকানের নামের নীচে লেখা থাকত, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক’। সেটা পরে লুপ্ত হয়ে যায়। আসলে পূর্ব পাকিস্থান প্রত্যাগত, দেশছাড়াদের মনে দেশের স্মৃতি, দেশের স্বাদ, দেশের গন্ধ জাগানিয়া, এই বাক্যটি, হয়তো বেদনার্ত, ছলোছলো নস্টালজিয়ার জন্ম দিত। দেশ বলতে, তখনো লোকে সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকা,-- এসবই মনে করত। আমার বাবা এসেছিলেন ১৯৪৮-এ। তখন আর নাকি থাকার মত পরিস্থিতি ছিল না। গ্রামের নাম ছিল ছাতক। আমার ঠাকুমার নাকি আশা ছিল , অচিরেই দুই দেশ এক হয়ে যাবে। চোরাগোপ্তা লুঠতরাজ, ইজ্জত লুট হত। অগ্নিসংযোগ হত। দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের গ্লানি নিয়ে, কোনোক্রমে দিন গুজরান। যে দোকান থেকে মাসের চালডাল, তেল-নুন আসত, দোকানটা কিনে নিল রফিক উদ্দিন। ছোট পিসিমার স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন। কারণ, স্কুলে পড়ানোর মত মাস্টার মশাইরা নেই। ওটা মাদ্রাসা হয়ে গেল। এক বিকেলে নাকি পুকুর ঘাটে , গ্রামেরই জোয়ান ছোকরা , মুসলিম লিগ করা, রহিমুদ্দিন চান করতে নামল। বিধবা ঠাকুমা ফ্যালফ্যাল করে দেখলেন। ঠাকুমার প্রবল শুচিবায়ু ছিল। জল দিয়ে জল ধুতেন বলে, আমরা ছোটবেলা হাসাহাসি করতাম। মুড়ি খেলেও , ঘাটে গিয়ে আচাতে হত। একই পুকুরে দুটো ঘাট। একটা ঠাকুমার, অন্যটা সধবা ছোট পিসির। উনি আমিষ খান। তাই। পুকুর এক, জলও এক। তবু দুই ঘাট। যেন দ্বিজাতিতত্ত্ব ।
‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক’ , --সেই স্মৃতি; বুকের ভিতরকার আকুলি-বিকুলি বেদনার সজল উপশম । আর কি করে যেন একটা পংক্তি উড়ে এল। পকেট হাতড়ে পেলাম না কাগজের টুকরো। অগত্যা, অরুণদা-শরণং । দু’তিনটে সিগারেটের খালি প্যাকেট ছিঁড়ে, কবিতার পংক্তিগুলো লিখে ফেলি। মাথার ভিতরে এরা মেঘ হয়ে জমে থাকে। পরপর কিছু লাইন এসে যায়। আবার থেমে যায়। প্রগতিবাদী নই। সামাজিক দায়বোধ থেকে লিখি না কবিতা, কিছু বন্ধুর মত। আবার সমাজের অন্যায়ও মেনে নিতে পারিনা। বামপন্থী রাজনীতি সমর্থন করি। বামপন্থীদের মন থেকে ভালোবাসি। কিন্তু কবিতা লিখি যখন, তাতে সমাজ-টমাজ থাকে না তাতে। আর্তের হাহাকারও নয়। পূর্ণিমার চাঁদকে, পূর্ণিমার চাঁদই মনে হয়। ঝলসানো রুটির মত মনে তো হয় নি। বরং গান্ধী বাগের সাপনালার জলে চাঁদের ছায়া দেখে, মন গুণগুণ করেছে, মান্না দে; ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে। মঞ্জু খুব ভালো গান গায়। চারমিনার থেকে তামাক বের করতে করতে সে গাইত। জ্যোতিদা ততক্ষণে গাঁজা ডলে ফেলেছে। সিগারেটের সরু মুখ দিয়ে গাঁজা পোরা বেশ কঠিন কাজ। জ্যোতিদা আমাদের থেকে বয়সে সামান্য বড়। ডাক্তারি পড়ে। মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে সুলভে গাঁজা পাওয়া যায়। সে-ই আনত। গান্ধিবাগের বেনহে বসে, চাঁদের আলোয়, গান থেকে গানে, কবিতা থেকে কবিতায়, ভাসতে ভাসতে, মেঘ হয়ে, বিনয় মজুমদার হয়ে, জীবনানন্দ হয়ে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় হয়ে, আমাকে তুই আনলি কেন ? ফিরিয়ে নে। আশ্বিন-শেষের ঘাস ভিজে উঠত , আবছা শিশিরে। শিশিরে ভেজা ঘাস মাড়িয়ে বাড়ি ফিরছি। টিমটিমে রিক্সার আলোয় ও কার মুখ দেখলাম ? স্বাতী কি ? ডেকে উঠতে গিয়েও , ডাকা হল না। এলাইড এজেন্সির সামনের মোড় ঘুরে, দ্রুত চলে গেল রিক্সা। এখান থেকে ডাক দিলে, সে ডাক কখনোই স্বাতীর কানে পৌঁছবে না। আমার ডাক কখনো কি পৌঁছবে স্বাতীর কানে ?
( ক্রমশঃ)
।।২।।
দেওয়ালের ভাষা
দিপু তখন ক্লাস ফোর। নাকি ফাইভ ? ফোরই হবে। ফাইভ থেকে তো হাই স্কুল। সকালের স্কুল। এক সকালে স্কুলে গিয়ে দেখে, স্কুলের সাদা দেওয়ালে, আলকাতরা দিয়ে লেখা, ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ ; এরই পাশে ‘ বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’। সেটা শীতের এক সকাল। সবে নতুন ক্লাস শুরু হয়েছে। শীতের কাচা-মিঠে রোদে , জটলাটা বাড়তে লাগল। রেল কলোনিতে এমনিতেই , হামেশা চোখে পড়ে, দেওয়ালে কত কি লেখা থাকে। দাঁদ-হাজা, নিতাই পিল থেকে শুরু করে, কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ, মজদুর ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলন, বিশাল জনসভা,- রেলওয়ে ইন্সিটিউটের দেওয়ালে, রেলওয়ে কো-অপারেটিভের দেওয়ালে, লোকোশেডের দেওয়ালে, ওয়্যারলেস কলোনির কোয়ার্টারের দেওয়ালে , - কত কি লেখা থাকত। কিন্তু স্কুলের দেওয়ালে , আলকাতরা দিয়ে লেখা, এই দু’টি বাক্য, কি রকম রহস্যময় ঠেকল। বিশেষ করে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’,- এক দুর্বোধ্য রহস্যের ইসারা নিয়ে, সকলের মাথার ঘিলুতে ভেসে রইল। ক্লাস শুরু হবার মুখে স্যার আসছেন, নাম ডাকার খাতা নিয়ে। সবাই ছুটে ছুটে ঢুকে গেল ক্লাসে। স্যার এক মুহূর্ত , থমকে দাঁড়ালেন বন্দুকের নলের সামনে , কিঞ্চিৎ বিমূঢ় দেখালো যেন তাঁকে, হয়তো তিনিও পারেননি এর মর্মোদ্ধার করতে। শ্লথ, মন্থর পদক্ষেপে ঢুকলেন ক্লাসে। নাম ডাকা শুরু করলেন। ইনি সুধীর স্যার। কৃষ্ণকায়, দীর্ঘদেহী, চোখ দু'টো লালচে, যা কালো ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়েও স্পষ্ট দেখা যায়। এক মাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল। ব্যাক ব্রাশ করা। গলার স্বর তীক্ষ্ম , গম্ভীর । ক্লাসে ঢোকা মাত্র, গোটা ক্লাস নিস্তব্ধ। পেছনের বেঞ্চে যারা বসে, তাদের হৃৎপিন্ড থেমে যায়। যে ছাত্রের দিকে তাকান, যেন তার অন্তর পড়ে ফেলতে পারেন, এমন মর্মভেদী দৃষ্টি । সুধীর স্যার ইংরেজি পড়ান। তাও আবার গ্রামার। মুখস্থ বিদ্যার ঘাটতি থাকলে আর দেখতে হতো না। দীপুদের স্কুলের চারপাশে ভেরেন্ডা গাছের ঝোপ ছিল। ক্লাস ক্যাপ্টেনের ডাক পড়ত তখন। একটা যুৎসই , শক্তপোক্ত ডাল ভেঙে আনতে হত তাকে। সেটা আছড়ে পড়ত , কোনো অমনোযোগী ছাত্রের পিঠে, হাতে, ঊরুতে। নীচু ক্লাসে তখনো দীপুরা হাফ প্যান্ট। পায়ে দাগ পড়ে যেত। আর যারা দাগী, একই ক্লাসে দু'বছর ঘষটানো, তারা কাঁদতও না। মার থেকে বাঁচার জন্য , বেঁকেচুরে লাফালাফি করত না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাক্ত,আর শোনা যেত শপাং শপাং শব্দ। তারপর বীরের মত ঘাড় হেলিয়ে, যেন কিছুই হয়নি, তেমন মুখ করে বেঞ্চে বসে পড়ত।
সেদিন সুধীর স্যার , নাম ডাকা শেষ করে, চেয়ারে বসে পড়লেন। উনি সাধারণত গোটা ক্লাসটাই করেন দাঁড়িয়ে। এদিন স্যারের যেন পড়ানোয় মন নেই। বাংলা থেকে ইংরেজিতে কতগুলো ট্রান্সলেশন করতে দিলেন। তারপর মোটা একটা বই খুলে পড়তে লাগলেন। এদিন ক্লাসে মৃদু গুঞ্জনও শোনা যেতে লাগল। তবু যেন স্যারের ভ্রুক্ষেপ নেই। ক্লাস শেষ হবার মিনিট পনেরো আগে খাতা চেয়ে নিলেন। ঢং ঢং করে ক্লাস শেষ হবার ঘণ্টা বাজল। যে খাতা গুলো দেখা বাকী ছিল, সেগুলো নিয়ে গেলেন। ক্লাস ক্যাপ্টেনকে বলে গেলেন, এক ঘণ্টা পর কমন রুম থেকে নিয়ে যেতে। স্যার চলে যাবার পর, ওরা সবাই , আবার দেওয়ালের সামনে জটলা করে দাঁড়ায়। ওরা ভেবে আকুল হয় , বন্দুকের নল কি করে ক্ষমতার উৎস হতে পারে। অসীম ক্লাসে সবচেয়ে ডানপিটে এবং পড়ায়ও ভালো। বরাবর দশের ভিতর থাকে। সে খানিক ভেবে বুঝিয়ে দেয়। পুলিশের কাছে বন্দুক থাকে , দেখেছিস তো ? আর সেজন্যই আমরা পুলিশ দেখলে ডরাই। সেটা তো বন্দুকের জন্যই। একেবারে সহজ অংক। পুলিশের কাছে বন্দুক থাকে বলেই পুলিশের এত ক্ষমতা। আর তাই যাকে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পারে। বাকীরা মেনে নেয়, অসীমের যুক্তি। কিন্ত খটকা থেকে যায়, অন্য বাক্যটা নিয়ে। চীনের নাম ওরা ভূগোলে পড়েছে। কিন্তু ওদের চেয়ারম্যান কি করে আমাদের চেয়ারম্যান হবে? চেয়ারম্যান শব্দটাও নতুন ঠেকছে। প্রেসিডেন্ট শুনেছে। সেবার স্কুলের মেধাবী ছাত্রদের হাতে পুরষ্কার তুলে দিতে , এন.এফ.রেলের জিএম এসেছিলে। হেডমাস্টার জিএম-কে প্রেসিডেন্ট বলছিলেন। ওরা জিএম, ডিআরএম কি জানে। কিন্তু চেয়ারম্যান কি ,ঠিক বোঝেনি। অসীমই বলল, তটিনী স্যারকে জিজ্ঞেস করে নিলেই হবে। ফর্সা, গোলগাল , সদাহাস্যময় তটিনী স্যার ছাত্র মহলে খুব জনপ্রিয়। স্যারের ইংরেজি উচ্চারণ শুনলে মনে হয় সাহেব । ওরা বলত ' পিকুলিয়ার' , স্যার বললেন , ওটা হবে 'পিকিউলিআ' । 'ক'-টা জোর দিয়ে , কিরকম মোচড় দিয়ে বলতেন; শেষের 'আর'-টা উহ্য থাকত। এর পর থেকে পিকু রেডিওতে বিবিসি চালিয়ে , চেষ্টা করেছে পিকিউলিআ শোনার। কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছিল, সাহেবরা শব্দের শেষে 'আর' থাকলে , ওটা উহ্য রাখে। তটিনী স্যার তো ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন, তাই স্যারে ক্লাস মানেই অফুরন্ত গল্পের ভান্ডার। সেদিনই কমনরুমে গিয়ে অসীম, পিকু, দীপুও জুটেছিল শেষে, তটিনী স্যারকে জিজ্ঞেস করে, চেয়ারম্যান মানে কি? স্যার প্রথম একটু অবাক হয়েছিলেন প্রশ্নটা শুনে। পরে বুঝতে পারেন, কোন প্রসঙ্গে এই প্রশ্নটা করা হয়েছে। তটিনী স্যার বললেন, তোমরা সভাপতি যাকে বল, সেটাও চেয়ারম্যান।কমনরুমের কোণায় বসা সুধীর স্যার বলে উঠলেন, তটিনী বাবু, আসলে ওদের চীনে পেয়েছে। সুধীর স্যারকে ওরা আগে খেয়াল করেনি। স্যারের আওয়াজ পেয়ে, তটিনী স্যারকে, আসি স্যার,- বলেই একছুটে বেরিয়ে যায় কমনরুম থেকে। এর কিছুদিন পরই একটা নতুন শব্দ শোনে দীপু। নক্সাল। জিআরপি কলোনির লাল ইটের কোয়ার্টারের দেওয়ালে কালো রঙে লেখা, 'নক্সালবাড়ির লাল আগুন দিকে দিকে ছড়িয়ে দাও'। নীচে ইংরেজিতে লেখা সিপিআই (এমএল)। দীপু সিপিএম জানে। ইলেকশনের সময় নাম শুনেছে। যদিও জেতে অবশ্য কংগ্রেস। ওই সময় মজার মজার গান নিয়ে সিপিএম- এর মিছিল ঘুরত রেল কলোনিতে। দীপুর বাবাও সিপিএমকে ভোট দিতেন। কাস্তে হাতুড়ি চিহ্নটা কলোনির দেওয়ালে দেওয়ালে , আঁকা থাকত। কিছুদিনের মধ্যে সাহেব কলোনির সজল কাকুকে পুলিশ রাতের বেলা ধরে নিয়ে গেল। কাকু তো সিপিএম করে। পিকুর বাবা ডাক্তারী পড়া ছেড়ে ঢুকেছিলেন রেলের চাকরীতে। শুধুমাত্র রেলে সিপিএম-এর সংগঠন করবেন বলে। এটা অনেক পরে জানতে পারে দীপু। দীপুর ভয় হয়, সিপিএম করলে কি পুলিশ ধরে নিয়ে যায়? বাবাও তো সিপিএম । তবে তেমন সক্রিয়ভাবে নয়। বাবা বললেন, সজল কাকু নাকি সিপিএম ছেড়ে নক্সাল হয়ে গিয়েছিলেন। এখন চারদিকেই নক্সালদের পুলিশ ধরছে। সে এক সময় বটে। স্কুলে যেতে আসতে, ওরা এসব নিয়েই গল্প করত। ওদের মধ্যে রতন থাকত সজল কাকুর পরের কোয়ার্টারে। রতন যে কতবার সেই গল্প শুনিয়েছে। গোটা কলোনি জিআরপি, আরপিএফ আর পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। রাত একটা। সজল কাকুর দরজার কড়া নাড়ল পুলিশ। ও নাকি জানালা দিয়ে দেখেছে, হাতকড়া পরা সজল কাকুকে হেঁটে যেতে। অনেক বছর সজল কাকুর চাকরি ছিল না। রেল ইউনিয়ন মাসে মাসে কিছু টাকা দিত ।
কিছুদিনের মধ্যেই এলো , আরো উত্তেজনার দিন। রেডিও তখন সবাই শুনত। ২৫ শে মার্চ পাকিস্তানের সেনারা বহু মানুষকে মেরে ফেলেছে, গুলি করে। বেঁধে গেল ভারতের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধ। সমস্ত গাড়ির হেডলাইটের উপরের অংশে কালো রঙ করা। রেলের লোক এসে সমস্ত কলোনিতে গর্ত করে গেল। বাবা বললেন, একে বলে ট্রেঞ্চ। মাঝেমাঝে সাইরেন বাজত। রেলের এই সাইরেন বদরপুরে বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়। ট্রেন এক্সিডেন্ট হলে বা কদাচিৎ আগুন লাগলে , সাইরেন বাজত। সাইরেন ক'বার বাজল , গুনে বোঝা যায়, মালগাড়ি না প্যাসেঞ্জার ট্রেন এক্সিডেন্ট হয়েছে। তো , রাতে সাইরেন বাজলে আলো নিভিয়ে ফেলতে হত। এরমধ্যে , স্কুলেও ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছে। স্কুলের সমস্ত কাচের দরজা-জানালায় কাগজের টুকরো আড়াআড়ি করে আঠা দিয়ে লাগানো, যাতে বোমা পড়লে কাচ ভেঙে গায়ে না বেঁধে। রাত গভীর হলে শোনা যেত গোলাগুলির শব্দ। মর্টার, স্টেনগান, মেশিনগান শব্দগুলো দীপু জেনে গেল। মাঝেমধ্যে খুব নিচু দিয়ে উড়ে যেত বিমান। তখন সাইরেন বাজত। আর সবাই মাটিতে শুয়ে পড়ত। এগুলো ছিল মহড়া। রেডিওতে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয়তার শিখরে। কমপ্লান না খেয়েও, ডাল-ভাত-মাছ আর কদাচিৎ পাঁঠার মাংস, কে.জি দশ টাকা, খেয়েই দীপু বাড়ছিল। দীপুর পাশের কোয়ার্টারের চন্দু , একসাথেই স্কুলে যেত। স্কুলের বাথরুমে কতগুলো চিহ্ন দেখিয়ে বলেছিল, এগুলো কি জানিস? চন্দু সব জানায়, বোঝায়। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। বৈশাখের আঁচ লাগা রোদ। স্কুলের লাগোয়া শিমুল তুলোর গাছের ছায়ায় বসে, চন্দু খুলে দেয় এক অচেনা-অজানা অন্ধকার জগতের দ্বার। দীপুর নিষ্পাপ সারল্য , সেদিনই হারিয়ে গেল চিরতরে। কো-এডুকেশন স্কুলে আর কোনোদিন সে মেয়েদের দিকে সহজ ভাবে তাকাতে পারেনি। চন্দু একদিন লাল ইটের টুকরো দিয়ে বাথরুমের দেওয়ালে লিখে রাখে 'শিল্পী + রতন' । চন্দু শিল্পীকে চেয়েছিল। কিন্তু পাত্তা পায়নি। চন্দুর বাবা ফিটার। চন্দু ক্লাস ওয়ান থেকেই ফেল করে করে আসছে। চন্দুই একদিন শিল্পীকে দেখায়। দীপু এই প্রথম অন্যরকম চোখে কোনো মেয়েকে দেখে। আর সেই দেখাই, দীপুর মনে , নারীর সৌন্দর্যের একটা চিরস্থায়ী ছবি এঁকে ফেলে।
( ক্রমশ)
।। ৪ ।।
স্মৃতি
মতিলাল-এ এলেই আমার মনটা ভালো হয়ে যায়। মনে হয়, চেনা পৃথিবীর বাইরে, অন্য একটা গ্রহে এসে গেছি। সব সময় চাপা একটা গুঞ্জন চলছে। খুব কম খরিদ্দার থাকলেও, এই গুঞ্জনটা শুনতে পাই আমি। আমার পছন্দের শেষ কোণের টেবিলে বসে পড়ি। শেখরদা চোখের ইসারায় জানতে চায়, চা দেবে কিনা। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই। আজ ক্যাশে পরিমলদার দাদা বসেছেন। ভদ্রলোক সব সময় ধুতি পাঞ্জাবী পরেন। আর পরিমলদা পরেন শার্ট-প্যান্ট । পরিমলদার দাদাকে আমরা দাদা বলেই ডাকি। দাদা আবার বাকীতে বিশ্বাসী নন। দোকানে কালো টিনের পাতে সাদা রঙে লেখা ‘আজ ংদ,কাল বাকী’। ইংরেজিতেও লেখা আছে, ‘টু ডে ক্যাশ, টুমরো ক্রেডিট’। বেশীর ভাগ দোকানেই এটা লেখা থাকে। কেউ আবার সবিনয়ে লিখে রাখে, ‘ বাকী চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’। তবে এরা যে ধারে কিছু বেচত না, এমন নয়। তবে আনকোরা নতুন খরিদ্দারকে আবশ্যই নয়। কিছুদিন কেনাকাটা করার পর , বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে, তবেই বাকীর খাতা খুলত। শুরুটা হত এরকম। দেড় দু’হাজার টাকার কেনাকাটার পর, দেখা গেল, দু’তিনশো টাকা কম পড়ছে। তখন, দোকান-মালিক নিজে থেকেই বলে, ঠিক আছে নিয়ে যান, কাল দিয়ে যাবেন। খরিদ্দার এক দু’দিন পর বাকী টাকা দিয়ে গেলে, দোকান-মালিক বুঝত , মানুষটি পয়সা মারার মত নয়। মারোয়াড়ীরা ধারে জিনিষ বেচতে আপত্তি করে না। ওদের দোকানের সামনে হিন্দিতে লেখা থাকে, ‘শুভ লাভ’। মালিক মারোয়াড়ী হলেও, কর্মচারীরা অধিকাংশ বাঙালী। দু’একজন মারোয়াড়ী কর্মচারী অবশ্য সব দোকানেই থাকে। মালিক ক্যাশে বসে থাকেন। পাশে কারো থাকে পেতলের লোটা। মটকিতে জল। ওদের দোকানে কাপড়ের দাম বোঝা যায় না। অনেক মারোয়াড়ী দোকানে ঝুলিয়ে রাখে, ‘ ফিক্সড প্রাইস’। বেশী দরদাম করলে, ওটা দেখিয়ে দেয়। ওদের দোকানে একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেছি, ওদের বাঙালী কর্মচারীদের মধ্যে কেঊ মারোয়াড়ী ভাষা জানে, আর মালিক তার সাথে ওই ভাষায় কথা বলে, দাম ঠিক করে নেয়। তেমন হলে বাকীতেও কাপড় দিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলে , মারোয়াড়ীরা দশ টাকার কাপড়ে তিরিশ টাকা দাম বসিয়ে বেচে বলেই, ওদের বাকী দিতে ভয় নেই। এই সব কথা শুনে, আমি পারতপক্ষে মারোয়াড়ী দোকানে কিছু কিনতাম না। শুধু মনে হত, বেশী দাম নেবে। পুজোর শার্ট প্যান্টের কাপড় কিনতে একটি প্রসিদ্ধ বস্ত্রালয়ে গেলাম। খুব খাতির করল। সেলাই করতে যাচ্ছি, বুদ্ধ’র সাথে দেখা, সেন্ট্রাল রোডে। বলল, চল, আমিও যাচ্ছি। টেইলার মাস্টার বলল, কাপড় কম দিয়েছে। ওত ঘের দিয়ে ব্যালবটম হবে না। আর অমিতাভ বচ্চনের প্যান্টের ঘের তো ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। মিঠুনেরও তাই। বুদ্ধ হাসছে। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, রাতুলের টেইলারের কাছে যাওয়া হবে। রাতুল ফাটক বাজারে এক টেইলারের কাছে শার্ট- প্যান্ট বানায়। সে নাকি কম কাপড়েও ভালো পোশাক বানায়। তূলাপট্টি থেকে রাতুলকে ডেকে আনা হল। ফাটক বাজারেরে গলির গলি, তস্য গলি ঘুরে, পৌঁছলাম আমরা। টেইলার কাপড় দেখে গম্ভীর মুখে কাপড় মাপতে শুরু করলেন। তারপর একটা কাগজে কি সব হিসেব করলেন। এবার আমার গায়ের মাপ নিতে শুরু করলেন। তখনো মুখ গম্ভীর। মাপ নেওয়া শেষ হল। এবার মুখে হাসি ফুটল। মাপকে উনি নাপ বলেন, তাই প্রথম বুঝিনি। বললেন, নাপ ঠিক মত না নিলে, ই কাপড়ে হইত না। আমি ফকর খলিফা। আমার নানাও খলিফা আছলা। যে কুনো ডিজাইন বানাইতাম পারি। ইতা আফনারার ফ্যাশন মার্কা টেইলার মাস্টার হকলে পারতা নায়। খলিফা শব্দটা কতকাল পর শুনলাম। বাবার মুখে একসময় শুনতাম। ডেলিভারি পাঁচ দিন পর। সেলাই খরচ অবিশ্বাস্য কম। মাত্র সত্তর টাকা। অন্যরা নেয় দেড়শো। রাতুল খুব খুশি। এতদিন সবাই ওকে কথা শোনাত, ওর এই টেইলারের কাছে শার্ট প্যান্ট বানানো নিয়ে। আসলে, রাতুল বরাবরই সাধারণ থাকতে পছন্দ করে। যথেষ্ট অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে হয়েও, সে অতি সাধারণ জীবন যাপনে আভ্যস্ত।
শেখরদা তিন নম্বর কাপ চা দিয়ে গেল। অরুণদার দোকান থেকে আরও তিনটে চারমিনার কিনে আনলাম। বাকীতে। তিনটে চার আনা। দশ-বারো টাকা হয়ে গেলে অরুণদা, তাগাদা দেবে। তার আগে নয়। কারণ, ও জানে, এরপর বাকী আরও বাড়লে, আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হবে না। ধারের অংক বেড়েই চলবে। বুদ্ধ প্রচণ্ড সিগারেটখোর। একটা চারমিনারের আগুন দিয়ে আরেকটা ধরায়। বুদ্ধ’র অবশ্য মাসকাবারি বন্দোবস্ত। আমাদের মধ্যে যারা চাকরী পেয়ে গেছে, বুদ্ধও একজন। সরকারী স্কুলের মাস্টার। আমি আর মামা রয়ে গেলাম বেকার। মামা’র অবশ্য চাকরী পাওয়ার কোনো হেলদোল নেই। সে আপন ভাবে মস্ত মওলা। নিজের পরের বলে কোনো ভেদাভেদ তার নেই। তার পকেটে যদি দশ টাকা থাকে, অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে, কাল আর কারো কাছে হাত পেতে দশ টাকা ধার নিয়ে নেবে। মামার একটা নাম আছে বটে। তবে সেটা কেউ এখন আর বলে না। একদিন জানা গেল, সম্পর্কে সে আমাদের জুনিয়র, আশীষের মামা হয় এবং আশীষ তাকে মামা ডাকে। সেই থেকে তাকে আমরাও মামাই ডাকতাম। এমনকি ওর বাড়ি গিয়ে ওকে, দরজা থেকে , মামা, মামা বলে ডাকি। এতে ওর কোনো আপত্তি হত না। মামা’র মা অবশ্য প্রথম দিন অবাক হয়েছিলেন। পরে সবটা জেনে খুব হেসেছিলেন। মামা’র মাকে আমরা মাসী ডাকতাম। মামা’র বাবা ছিলেন, চা-বাগানের ম্যানেজার। সেটা আবার টি বোর্ডের সরকারী বাগান। বাকী সবাই কাজ সেরে বাড়ি ফিরে, চা – বিস্কুট খেয়ে তারপর আসবে। আমি অপেক্ষায় থাকে, মামা কখন আসবে। তবে সে যে আসবে,তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমনও হয়, সাত দিন ওর কোনো দেখাই নেই। আসলে ওর বন্ধুবর্গ ছড়িয়ে আছে শহরময় ; যাদের আমরা চিনিও না। সকলকেই সময় দিতে হয় ওকে। পাঁচটা বাজতেই মতিলাল জমজমাট। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের আড্ডার ঠেক মতিলাল। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের আড্ডার ঠেক ছাত্র বান্ধব মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সিভিল হাসপাতালের ঠিক উল্টো দিকে। ওখানেই মেডিক্যাল কলেজের বাস এসে থামে। নীল রঙের বাসটা প্রেমতলা পয়েন্টে টার্নিং নিতে, যেই গতি কমায়, একদল ছাত্র লাফিয়ে নেমে যায়। সারা দেশের ছেলেরা থাকে এই বাসে। শেখরদার তখন ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আমি উঠে পড়ি কোণের টেবিল ছেড়ে। এটাই অলিখিত নিয়ম। এক কাপ চা না নিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো যায়, যদি দোকান ফাঁকা থাকে। ভিড় বাড়লে, হয় খাও, নয় যাও। এনিয়ে মান-অভিমান নেই আমাদের। মালিক-কর্মচারী সবাই জানে, আমি যখন একবার এসে পড়ি, শেষ বন্ধুটির সঙ্গ যতক্ষণ পাব, ততক্ষণ এই তল্লাট ছেড়ে যাব না। মাঝে হয়তো একবার দু’বার উঠে , অরুণদার দোকানের সামনে দাঁড়াব। পান খাব, সিগারেট খাব। অরুণদা তখন থাকে ঝালুপাড়া। বাড়ির মালিক নেপালি। আশেপাশে অনেক মদের ঠেক। দশটা সাড়ে দশটা না বাজলে বাড়ি যাবার তাড়া নেই। সময় কাটাতে এমনও হয়েছে, আমরা, প্রেমতলা থেকে, মানে মামা আর আমি, অরুণদাকে বাড়ি অবধি এগিয়ে দিয়েছি। তারপর অরুণদার কাছ থেকে তিন টাকা ধার নিয়ে, মামাকে লিংক রোডগামী অটোতে তুলে দিয়ে, একা একা হেঁটে বাড়ি ফিরেছি।
এই জমজমাট আড্ডার মাঝেও আমি টের পাই, অতল একাকীত্ব। প্রায়ান্ধকার রাস্তায়, হেঁটে যেতে আমার মাথায় উড়ে আসে, কবিতার পংক্তি। কখনো যেরকম উড়ে আসে, তেমনই ভেসে যায়। আর কখনো , মাথায় ক্রমাগত ভেসে থাকে ; একটা লাইন, এভাবেই উড়ে এল। মামার অটোর বিলীয়মান লাল আলো দেখতে দেখতে, কি করে যেন মনে ভেসে এল, -- আমি তো নিঝুম রাত্রি, আকাশের এক কোণে জমে থাকা মেঘ। দ্রুত পা চালাই। আঙুল নিশপিস করছে, কাগজ আর কলমের জন্য।
( ক্রমশ)
।।৫।।
হাতে খড়ি
#
তখন সকাল প্রায় ন’টা বাজে। দিপুদের কারো কোয়ার্টারেই দেওয়াল ঘড়ি নেই। তবু ওরা নিখুঁত ভাবে সময় বুঝতে পারে। আসলে রেডিওই ওদের ঘড়ি। দিপুর মা সবসময় দরজা বন্ধ করে রাখেন। তেমন গোপনীয়তা ওদের জীবনে নেই। কলোনি-জীবনে, পুরো কলোনিটা আসলে একটা যৌথ পরিবার। কাকু- জেঠু –কাকিমা- জেঠিমা মিলে এক যৌথ সংসার। দিপুর মা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন কলোনির সবাই ওর মাকে নিয়ে যায় রেল- হাসপাতালে। দিপু থাকে কারো বাড়িতে। দরজা বন্ধ রাখাটাই দিপুর বাড়ির একমাত্র গোপনীয়তা। সেটাও সকালে। তখন ওর মা’র রান্নার সময়। বাসন মাজার সময়। ঘর মোছার সময়। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ওর বাবা ঘরে নেই। লাইন আছে। ট্রেন নিয়ে যাওয়াকে বলে, লাইনে যাওয়া। দিপু দরজা খুলে দেখে , বাবলু। হাতে একটা পত্রিকা। এত সকাল বেলা এসেছে, মানে গুরুতর কিছু। সাধারণত ওর সাথে দিপুর দেখা হয়, বিকেলে। এই সময় কেউ এলে ওর মা বিরক্ত হন। কাজে অসুবিধে হয়। মা’র তো তখন দম ফেলার ফুরসৎ নেই। দিপুর বাবা লাইনে গেলে, মাছ এনে দেন, সামনের কোয়ার্টারের কাকু। মশলা বাটা, মাছ কাটা , লাকড়ি জ্বেলে উনুন ধরিয়ে রান্না করা, সব একা হাতে মা’কেই করতে হয়। সবাই তাই করে। তবে যাদের ঘরে লোক বেশী, তাদের অসুবিধে হয় না। দিপুর তো কোনো বোনও নেই। বাবলুদের আবার কাজের মেয়ে আছে। ওর বাবা পে-অফিসার। ওরা থাকে বাংলোতে। এগুলো ব্রিটিশ আমলের তৈরি। বিশাল সব কাঠের দরজা- জানালা। ওদের বাংলোতে আবার টেলিফোন আছে। স্টেশনে ছোট একটা এক্সচেঞ্জ আছে। এই ফোন শুধু রেল এরিয়াতে কাজ করে। কালো বিশাল টেলিফোন। এরকম টেলিফোন দিপুর দাদুর বাড়িতে আছে। ফোন তুললে, কেউ বলে , নাম্বার প্লিজ। তখন নম্বর বলতে হয়। কিছুক্ষণ পর, অ-প্রান্ত থেকে , কেউ হ্যালো বলে। দাদুর বাড়ির নাম্বার ফাইভ টু থ্রি। মামার এম্বেসেডারের নাম্বার, টি আর এ এইট জির থ্রি।
দিপুদের কোয়ার্টার বাবলুদের তুলনায় অনেক ছোট। বসার চেয়ারও মাত্র দুটো। তাও বেতের। দুটো মুড়া আছে। বাবলুদের বাংলোয় বিশাল বিশাল সব সোফা। বসলে শরীর ডুবে যায়। এগুলো নাকি, রেলের থেকে দেওয়া। দিপু বুঝতে পারছে না, বাবলুকে ঘরে এনে বসাবে কি না। তার চেয়ে বরং বাবলুকে নিয়ে সে জুমবস্তির দিকে হাঁটা দেয়। ওরা রেল কালীবাড়ির চত্বরে এসে বসে। সামনে বিশাল একটা পুকুর। এদিকে বেশীর ভাগ কোয়ার্টার টিলার উপর। কালী বাড়িও একটা টিলার উপরে। পুকুর থেকে টিউবওয়েল দিয়ে জল তোলা হয়। কালী পুজোর সময় প্রচুর জল লাগে। বড় বড় এনামেলের পাত্রে খিচুরি রাখা হয়। কিছু ক্লাব কালী পুজো করে। এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়, কে কত উঁচু কালী মূর্তি বানাতে পারে। নব জাগ্রত সংঘকে এখন পর্যন্ত কেউ টেক্কা দিতে পারেনি। তবে এই লম্বা মূর্তি তৈরির প্রচলন হয়েছিল, ওয়্যারলেস কলোনির কুড়ি ফুট লম্বা শীতলা মূর্তি বানানো থেকে। শীতলার বাহন গাধা, হাতে ঝাড়ু। গাধার চোখ করা হয় মার্বেল দিয়ে। ওই সময়টা প্রতি বছর স্কুলে বসন্তের টিকা দেওয়া হত। জরুরী অবস্থার সময় বাড়ি থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল, স্কুলে কোনো রকম ইঞ্জেকশন না নিতে। সঞ্জয় গান্ধী তখন খুবই কুখ্যাত। নাশবন্দিটা ওরই মাথা থেকে বেরোয়। বাবলু হাতের পত্রিকাটা খুলে ধরল। আসাম ট্রিবিউন পত্রিকা। ট্রেনে চেপে একদিন পর আসে গৌহাটি থেকে। আসাম ট্রিবিউনে খবরটা বেরিয়েছে। আগামী তিন দিন পর ম্যাট্রিকের ফল বেরোবে। ঝাপসা অক্ষরের মধ্যে প্রথম পাতার নীচে এক কোণে, বক্স করে ছাপা হয়েছে খবরটা।
দিপুরা নিউ কোর্সের দু’নম্বর ব্যাচ। প্রথম ব্যাচের ফল খুব একটা ভালো হয়নি। এমন সব প্রশ্ন এসেছিল, বিশেষ করে এডভান্স ম্যাথম্যাটিকসে, যেগুলো ওদের অংক বইয়ে নেই। তবে, তারাশঙ্কর স্যার ঠিক বের করছেন, প্রশ্নের উৎস। দেখা গেল অসমীয়া বইয়ের সাথে বাংলা বইয়ের অনুবাদে বিরাট ফারাক। অনেকগুলো অধ্যায়ই নেই। অংক, সমাজবিদ্যা, বিজ্ঞান, এডভান্স ম্যাথম্যাটিকসের অসমীয়া বই যোগাড় করলেন স্যারেরা। সেগুলো অনুবাদ করে পড়ালেন ক্লাসে। দিপুর বাবা গৌহাটি থেকে অসমীয়া বই আনালেন। প্রথম দিকে দিপু অসমীয়া বুঝতে পারত না। ধীরে ধীরে এই নতুন ভাষাও খানিকটা রপ্ত হয়ে গেল। সব শব্দের অর্থ সঠিক বুঝতে না পারলেও, পড়ে যেত। বারবার পড়ার পর, সেই অচেনা অসমীয়া শব্দ থেকে , একটা অর্থ গজিয়ে উঠত যেন। সেটা ঠিক না ভুল, দিপু জানে না। এই জানা – অজানার মধ্য দিয়ে, অসমীয়া বই থেকে , শুষে নিতে থাকে পরীক্ষার রসদ। পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পাবার পর একটা ধুকপুকুনি ছিল বুকে। গোটা প্রশ্নপত্র পড়ে ফেলার পর, নির্ভার লাগছিল মনটা। স্যার বারবার বলে দিচ্ছেন, সবাই ঠিক মত এডমিট কার্ড দেখে রোল নাম্বার লিখবে। এই এডমিট কার্ড ব্যাপারটা একেবারেই নতুন। একেকটা বিষয়ের পরীক্ষা যাচ্ছে, আর যেন একটা করে পাথর নেমে যাচ্ছে কাঁধ থেকে। বিজ্ঞানের প্রশ্ন পাবার পর হাত কাঁপছিল। শেষ প্রশ্নটা পড়ার পর , চোখ বুঁজে শ্বাস ফেলে। স্বস্তির শ্বাস। অসমীয়া বই থেকে বেশ কিছু প্রশ্ন এসেছে, যেগুলো ওদের বাংলা বইয়ে নেই। এডভান্সেও তাই হয়েছে। তারাশঙ্কর স্যার ভীষণ খুশি। কারণ, রহস্যটা তিনিই ভেদ করেছিলেন। তিনিই গৌহাটিতে যোগাযোগ করে জেনেছিলেন, অসমীয়া বইয়ের কিছু অধ্যায় বাংলা বইয়ে নেই। সেই অধ্যায়ের প্রশ্নগুলোর উত্তর,তাঁর সেরা ছাত্রছাত্রীরা গেল বার লিখতে পারেনি। দিপু এডভান্সের শেষ অঙ্কটা করে ফেলার পর, ভিতরে ভিতরে হালকা বোধ করছিল। পায়রার পালকের মত হালকা। ওদের স্কুলে, কোয়ার্টারে একরকম পায়রা থাকে। কেউ ওগুলো খায় না। বলে জালালি কবুতর। শাহ জালালের নামে ছাড়া এই কবুতর অনবরত বংশবৃদ্ধি করে, আর চারপাশে বিষ্ঠা ফেলে। শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেলে, বিষ্ঠার দলা ঘুলঘুলি থেকে গড়িয়ে পড়তে থাকে। ঘরের কোণে কোণে রাত হলে বসে থাকে। দিনেও থাকে। ওদের তাড়ানোও যায় না। দিপুর ধারণা এই জালালি কবুতরের মাংস খেতে নিশ্চয় অত্যন্ত বিস্বাদ। তাই কেউ খায় না। দিপুর মা অবশ্য বলেন যে জালালি কবুতর খেলে নাকি পাপ হয়। এগুলো সিলেটের শাহ জালালের নামে ছাড়া হয়েছে। দরগাহ, মাজার ,-- এগুলোর সাথে দিপুর পরিচয় আছে। অনেকেই অসুখ- বিসুখ হলে দরগাহ, মাজারে মোমবাতি, ধুপবাতি জ্বেলে আসে।
বাবলুর হাতে ধরা আসাম ট্রিবিউন টিলার বাতাসে কাঁপছে। বাবলু খুবই চিন্তিত। চিন্তা তো দিপুরও হচ্ছে। আর তিন দিন তো দেখতে দেখতে কেটে যাবে। ভাবতে অবাক লাগছে, ওদের স্কুল জীবন শেষ হয়ে গেল। অথচ মনে হচ্ছে, এই সেদিন মা দিপুকে স্কুলে নিয়ে ভর্তি করে দিয়ে এসেছিলেন। বাবলু এসেছিল ক্লাস এইটে। ওর বাবা লামডিং থেকে বদলি হয়ে এসেছিলেন। কালীবাড়ির নির্জনতায় অদ্ভুত শীতলতা আছে। কেজানে, এভাবেই প্রকৃতি একটু একটু করে দিপুর ভিতরে বাসা বেঁধেছিল কি না। আর প্রকৃতির সাথে নির্জনতাও যে মিশে থাকে। বাবলুর সাথে তার এমন একেকটি মুহূর্ত তৈরি হয়, যা আর ওদের জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে কিনা, কোনো নিশ্চয়তা নেই। মাইক্রোওয়েভ অফিসটা রেল ইন্সিটিউটের উল্টো দিকে। সকাল থেকেই ভিড় অফিসের সামনে। স্যারেরাও এসেছেন। কোনো এক রহস্যময় পদ্ধতিতে পরীক্ষার ফল আসে । কেউ এসে বলে যান চিৎকার করে, রোল নাম্বার সেভেন নাইন টু থার্ড ডিভিশন। কেউ জিজ্ঞেস করল নাইন সিক্স টু পেয়েছেন? উত্তর,- না নেই। কেউ মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। কেউ আনন্দে হৈ হৈ করছে। বাবলু আরা দিপু হাতে হাত চেপে দাঁড়িয়ে আছে। সময় কাটছে না। করবেটের গল্প থেকে প্রশ্ন আসত, টাইম ইজ পাসিং অন এ লিডেন ফিট ,- ব্যাখ্যা কর। পরীক্ষার ফল যেন সেই বাঘটা, যার অপেক্ষায় ওরা শিকারির মত দাঁড়িয়ে আছে। বাবলু সেকেন্ড ডিভিশন, দিপু ফার্স্ট ডিভিশন। প্রিয় বন্ধুর মন খারাপ বলে, দিপুরও আনন্দ হচ্ছে না। বাবলুকে ওর বাড়ির দিকে এগিয়ে দিয়ে , দিপু বাড়িমুখো হয়। ইংরেজি বাংলা মাঝে মাঝে বাবা পড়াতেন। বিশেষ করে ইংরেজি গ্রামার। ইয়া মোটা একটা গ্রামার বই, - হাইয়ার ইংলিশ গ্রামার,-- দেখে খুব আনন্দ হয়েছিল। এখন সেও মোটা মোটা বই পড়বে।
বাবলুর দুঃখ বেশী দিন স্থায়ী হল না। মার্কশিট আসার পর দেখা গেল ও পেয়েছে পাঁচশো নয়। এক নম্বরের জন্য ফার্স্ট ডিভিশন পায়নি। সেবার ওদের স্কুলে পাঁচ জন ফার্স্ট ডিভিশন। সতেরোটা সেকেন্ড ডিভিশন। স্কুল থেকে মিষ্টি খাওয়ানো হল। স্যারদের প্রণাম করে হৈ হৈ করে চলে গেল কালিদাস রায়ের ছাত্রদল। বাবলু চলে গেল গৌহাটি আর্য বিদ্যাপীঠ কলেজে। দিপু গেল শিলচর। জিসি কলেজে। দাদুর বাড়ি থেকেই পড়বে। বাবা যখন বাংলাদেশ যেতেন, তখন এনেছিলেন একটা প্যান্টের কাপড়। স্ট্রেচলন কাপড়। নতুন শার্ট আর স্ট্রেচলনের প্যান্ট পরে দিপু প্রথম দিনের মত কলেজে গেল। বদরপুরের কেউ নেই। সবাই চলে গেছে করিমগঞ্জ কলেজে। বিশাল গ্যলারির মত একটা ক্লাস। জানালায় শিক নেই। স্কুলের মত এক গাদা বই আনতে হয়নি। শুধু মাত্র একটা খাতা আর কলম। ওর রোল নাম্বার ফোর সেভেন্টি ফাইভ। কিসের ক্লাস জানে না। পাশে যে বসেছে তাকেও চেনে না। কে পড়াবেন, তাও জানে না। যেন অজানা-অচেনা একটা সমুদ্রের তীরে সে বসে আছে।
( ক্রমশ)
।।৬।।
স্মৃতি
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, কি চেয়েছ জীবনে ? বলব, স্নিগ্ধ ও পরিচ্ছন্ন একটা জীবন বাঁচতে চাই, যে-জীবনে , আর কিছু না থাক , থাকবে না কোনো কপট ছলনা , কিংবা কোনো মিথ্যার আড়াল থাকবে না। তিন মাস হয়ে গেল, কবিতা লিখতে পারছি না। আত্মমগ্ন হয়ে শব্দের কুহকে ডুবে, ডুবুরীর মত, নাকি উজ্জ্বল মাছের মত, লাজুক বিস্ময়ে, অপলক চেয়ে দেখা , জলের গভীরে , অতলে ডুবে থাকা, আম গাছের ডালের গায়ে, কালচে-সবুজ শ্যাওলা আর ডালে পেঁচিয়ে, জড়িয়ে থাকা জিম ধরা সাপ। কাঁকড়া খুঁটে খাচ্ছে মাটি। গোত্তা মেরে উঠে গেল কাংলা মাছ,- ধারালো , রূপোলী , মসৃণ সেই উত্থান। এই যে পুকুরের কথা লিখছি, এটা কোথাকার ? আমাদের বাড়িতে তো পুকুর নেই আর। পুকুর ছিল যেটা, বিক্রি হয়ে গেল, খানিকটা জমি সমেত, ছোড়দির বিয়ের সময়। আনিল দেব বড়ো সজ্জন লোক। বাবার এটাই ছিল আশংকা। জমি কিনে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হবে যে, যদি সে রগচটা লোক হয়, পান থেকে চুন খসলে, পায়ে পা লাগিয়ে, উচ্চগ্রামে ঝগড়া করতে শুরু করে, বা যদি সে অর্থবলে মশমশ করে আর বাড়ি বয়ে এসে, ছড়িয়ে যায় প্রতিপত্তির উত্তাপ, বাবা তবে খুব অস্বস্তি বোধ করবেন। আমরা তো খুবই সাধারণ লোক। বাবা তো ইস্কুল মাস্টার। বোনের বিয়ে দিতে পুকুর বেচতে হয়। আমরা নতুন কাপড় কিনি পুজোয়,তাও এক প্রস্থ। খুব সাধারণ দোকান থেকে কেনা হয়, যাতে দোকানে বাকী না পড়ে। শুধু পয়লা বৈশাখে আমরা দু’ভাই আর বাবার জন্য নতুন গেঞ্জি, মা’র আর বোনের জন্য ঘরে পরার শাড়ি, তাও চৈত্র মাসের রিডাকশন সেলে কেনা হয়। সব দোকানেই সস্তায় দাগ লাগা, বিক্রি না হওয়া কাপড়, কম দামে বেচে দেয়। দোকানে খুব একটা ভিড় হয় না। আমাদের মত স্বল্পবিত্ত পরিবারের মানুষরাই , খুঁজে খুঁজে এসব দোকান থেকে কাপড় কেনে। সাদা কাপড়ে বড় করে লাল রঙে লেখা থাকে ‘ রিডাকশন সেল’। অনেক বড় দোকান, নামী-দামী দোকান, যেমন, রামকৃষ্ণ, বাসন্তী, কিছু মারোয়াড়ী দোকান, এদের সাইন বোর্ডে লেখা থাকে,-‘অভিজাত বস্ত্র বিপণী’, যেখানে আমাদের অন্য সময় যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, আমাদের মত মানুষেরা কাপড় কিনতে ঢুঁ মারে। আমি অবশ্য স্বস্তি পাই না, এইসব দোকানে গেলে। যতই আন্তরিক ব্যবহার করুক, কি একটা হীনমন্যতা , কেন যে আমার মনে , কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে। খালি মনে হয়, অনধিকারীর মত এসেছি। আমাদের পুরো পরিবারের বাজেট থাকে তিন চারশো টাকা। বাবা গুনে গুনে টাকাটা মায়ের হাতে দেন। আমি মা আর বোনকে নিয়ে রিক্সা করে যাই। আমি যাই সাইকেলে। র্যালি সাইকেল। কলেজে ওঠার পর কিনে দিয়েছিলেন বাবা। বাড়িতে দুটো সাইকেল। আমার আর দাদার। বাবা হেঁটেই চলেন বেশীর ভাগ সময়। কোথাও যাবার খুব তাড়া থাকলে , তবেই রিক্সা চড়েন। আমরা রিক্সা ছেড়ে দিই কোনো একটা দোকানের সামনে এসে। তারপর এ-দোকান , সে-দোকান ঘুরে ঘুরে কাপড় দেখা হয়। পছন্দসই কাপড়ের দাম বেশী হলে, আমরা ছলনার আশ্রয় নেই। দোকানদার একটার জায়গায় দশটা শাড়ি নামায়। এগুলো আমাদের অস্বস্তি বাড়ায়। মাকে অসহায় দেখায়। আমাদের বাজেট তিন চারশো টাকা। তবু কেন যাও এসব দোকানে ? জিজ্ঞেস করেছিলাম মা’কে। মা বলেন, বড় দোকানে অনেক সময় সস্তায় দামী ভালো কাপড় পাওয়া যায়। পাড়ার কোন মাসিমা নাকি কবে সাতশো টাকার শাড়ী মাত্র তিনশোতে পেয়েছিলেন। এসব যেন লটারি পাওয়ার মত ঘটনা। আমাদের ভাগ্যে কখনো ঘটেনি। বাবা তো হিসেব করে ওই কটা টাকাই দেন। তবু মা বছরে একবার , রিডাকশন সেলের বাজারে সব বড় দোকান ঘুরে ঘুরে দেখবেন। সব দোকান ঘোরা হয়ে গেলে, জানিগঞ্জের , আমাদের বাঁধা দোকান, মহেশ পালের দোকান থেকে দুটো সব সময় পরার, মানে ঘরে পরার দুটো শাড়ি কিনবেন। আর তিনটে নতুন গেঞ্জি। এরপরও হাতে কিছু টাকা বেঁচে যায়। হেঁটে হেঁটে মা ক্লান্ত । ক্ষিদেও পায়। আমরা ভারতী সুইটসে রসগোল্লা, সিঙ্গারা, চা খাই। বোন ক্ষীরতোয়া ভালোবাসে। ওটা এক বাটি পাঁচ তিন টাকা। মা কিছুতেই খাবেন না। ইচ্ছে থাকলেও না। আমি জানি সেটা। ওই যে তিন টাকা বেঁচে গেল, ওটা ফেরার রিক্সা ভাড়া। পুজোর কাপড় বাবাই কিনে আনেন, মহেশ পালের দোকান থেকে। এনে বলে দেন, পছন্দ না হলে, ওই দামের মধ্যে বদলে আনতে। কিন্তু মা কিম্বা বোন, কখনোই বদলাতে যায়নি। শুধু দাদা আর আমি নিজেদের পছন্দ মত কাপড় কিনে দর্জির দোকানে বানাতে দিয়ে আসতাম। তবে ওই মহেশ পালের দোকান থেকেই কিনতে হত। ওই দোকান থেকে বাবা ধারে কাপড় কিনতেন। মহেশ পাল বাবার স্কুল জীবনের বন্ধু। সুতরাং বাবার যা স্বভাব, বন্ধুর দোকান থেকেই কিনবেন, অন্য কোনো দোকানে যাবেন না। বাড়ীর জন্য যত কম দামের কাপড় কিনুন না কেন, বিয়ের উপহার হিসেবে বেশ দামী শাড়ি কিনে আনবেন। আর পয়লা বৈশাখে সব বাকী চুকিয়ে দেন। সেটাই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। আর সেই বাকীর পরিমাণ বেশ কয়েক হাজার টাকা হয়। এত টাকা বাকী হলে , সংসারের খরচ অন্য দিকে কমাতেই হবে। আর বাবা কখনই টাকার বিনিময়ে ছাত্র পড়ান না। আমার ঠাকুর্দাও শিক্ষক ছিলেন। ঠাকুর্দার বাবা ছিলেন সংস্কৃত টোলের পণ্ডিত। বাবা সেই সুবাদে সংস্কৃতটা খুব ভালো জানেন। স্কুলে আমরা ভাই-বোন সবাই সংস্কৃত পড়েছি। আর পড়তে হত বাবার কাছে। সেটা ছিল এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। বাবা খুব রাগী । সামান্য ভুল হলেই বেত পড়ত পিঠে – হাতে। মা কিছু বলতেন না। শুধু চুপ করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যেন এটাই মায়ের নীরব প্রতিবাদ। সংস্কৃত শিখতে গিয়ে আমরা ভাই-বোন কেউই বাবার মার থেকে রক্ষে পাইনি। আর মাকে দেখতাম নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে। যেন তিনি এসে দাঁড়ালে বাবার রোষ কিছুটা লাঘব হবে। বাবাও তেমনি মায়ের উপস্থিতিকে গ্রাহ্যই করতেন না। তখন তিনি বাবা নন। শুধুই যেন শিক্ষক, যিনি অমনোযোগী ছাত্রকে শাসন করছেন। আমাদের ঘর বলতে ঠাকুর্দার বানানো বিশাল দুটো আলাদা ঘর। এক ঘরে আমি আর দাদা। অন্য ঘরে মা, বোন এক খাটে শোন, অন্য খাটে বাবা। ঘর দুটো আলাদা। মাঝে উঠোন। বৃষ্টি হলে ভিজে ভিজে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে হয়। টিনের চাল। কাঠের খুঁটি । ঝড় বৃষ্টি মনে হয় এই বুঝি পড়ে যাবে ঘরটা। রাতে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে ঘুম এসে যায়, বুঝতেই পারি না। আমি ছোট থাকতে রান্নাঘর ছিল বাঁশের। মাটির উনুনে ,লাকড়ি দিয়ে রান্না করতেন। পুকুরে বাসন মাজতেন। পরে বাবা পাকা রান্নাঘর বানান। তবে আজো আমরা মাটিতে পিঁড়ি পেতে বসে খাই। টেবিল চেয়ার পেতে ,বসে খাবার মত জায়গা নেই রান্না ঘরে। আসলে সময় সময়ের মত আগাম জানান না দিয়ে পালটায়। বাবার মত অ-সংসারী মানুষের পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব নয়। রান্নাঘরটা সামান্য বড় করে বানালেই হত। তবু কত বদল হল আমাদের বাড়ীতে। বাঁশের বাথরুম পাকা হল। স্যানিটারি পায়খানা হল। জলের কল এল। গ্যাসের উনুন হল। তখন মা’কে নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় থাকতাম। টানা একমাস মা’কে দাদা আর আমি ট্রেনিং দিলাম, কি করে গ্যাস জ্বালাতে হয়, নেভাতে হয়। মা খুব ভুলো মনের মানুষ। হয়তো গ্যাসের চুলোর নব ঘুরিয়ে গ্যাস ছেড়ে , দেশলাই জ্বালাতেই ভুলে গেলেন। তবে এক মাস লাগেনি শিখতে। তবু আমরা দেখভাল করতাম, মায়ের অধীত বিদ্যা কতটুকু সফল হয়েছে। মা শেষের দিকে বিরক্তই হতেন। বলতেন, যা তোরা। আমাকে আর শেখাতে হবে না। প্রতিদিন রান্নার পর কাপড় দিয়ে উনুন মুছে ঝকঝকে করে রাখতেন। রাতে বড় একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতেন। অনেকদিন পর্যন্ত রাতে ঘুমোবার আগে আমরা দেখে নিতাম সিলিন্ডার বন্ধ হয়েছে কিনা। একটা সময় পাড়ায় সিলিন্ডার চুরি শুরু হল। বাবা একটা লোহার শিকল কিনে আনলেন। দেওয়ালে মিস্ত্রি ডেকে লোহার হুক বসানো হল। এবার ,শিকল দিয়ে সিলিন্ডার সেই হুকের সাথে তালা মেরে রাখা হত। ভাগ্যিস বাবা শিকলটা বেশ বড়ই এনেছিলেন। না হলে তো আমাদের কাজ বাড়ত। রোজ সিলিন্ডারে শিকল পড়ানো, আর সকালে শিকল খুলে উনুনে লাগানো। গ্যাসের উনুন আনা নিয়ে মায়ের আপত্তি ছিল। সেটা অবশ্য খরচ বেড়ে যাবার আশংকায়। মা’কে বোঝানো হল যে এতে খরচ ক্মবে এবং মায়ের রান্নার ঝক্কিও কমবে। গ্যাসের উনুনের পিছনে পিছনে এলো প্রেসার কুকার। সেটার ঢাকনা লাগানো শিখতেও মায়ের অনেক দিন লেগে গেল। ডান বাম করে করে যেদিন মা প্রথম সাফল্যের সাথে প্রেসার কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে ফেললেন, সেদিন মায়ের মুখের হাসিতে এভারেস্ট জয়ের গর্ব মিশে ছিল। একদিন আমাদের বাড়ীতে এল সাদাকালো ছোট একটা টেলিভিশন। মায়ের আনন্দ সেদিন দেখে কে। আমরা দু’ভাই মিলে বাঁশের মাথায় এন্টেনা লাগিয়ে, সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিগন্যাল ঠিক করে নিলাম। বাবা অবশ্য টিভি দেখতেন না। তেমন সময়ও বাবার নেই। বাবার একটা ছোট হাত রেডিও ছিল, ওটা হাতে নিয়ে শোনা হত বলে আমরা হাত রেডিও বলতাম, মারফি কোম্পানির ; চারটে টর্চের ব্যাটারি লাগত। বাবা ওটা নিয়ে , বিছানায় আধশোয়া হয়ে খবর শুনতেন। এভাবেই আমাদের দিনগুলো রাতগুলো ছোট ছোট আনন্দের মধ্য দিয়ে কেটে যাচ্ছিল। শুধু একদিন আমাদের পুকুরটা চলে গেল। আর তার কিছুদিন পর, আমাদের বোনটাও চলে গেল শ্বশুর বাড়ী। খাঁ খাঁ করত মনটা। অনেকদিন।
( চলবে )
।।৭।।
কবির প্রতীক্ষা
একে তো সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, তার উপর আশেপাশে চেনা পরিচিত কেউ নেই। বাবলুর কথা খুব মনে পড়ছিল দিপুর। আজই ঘরে ফিরে একটা চিঠি লিখতে হবে। কলেজের পাশেই একটা পোস্ট অফিস আছে। খুবই সুন্দর পোস্ট অফিস। দুই ক্লাসের মধ্যবর্তী ফাঁকে কয়েকটা পোস্টকার্ড কিনে আনে দিপু। ভাবল, আজই বাবলুকে একটা চিঠি লিখতে হবে। ওরও ক্লাস আজ থেকে শুরু হয়েছে। এই নির্বান্ধব পরিবেশে , প্রায় গ্রাম্য পরিবেশে লালিত দিপু,-রেল কলোনি তো এক ধরণের গ্রাম্যতার কচুরিপানায় ভরা,- ভিতরে ভিতরে সিঁটিয়ে আছে। একেকজন অধ্যাপক আসছেন, নিজের বলছেন, কোন বিষয় পড়াবেন, সেটা জনিয়ে দিচ্ছেন। ফিজিক্স ক্লাসে একজন এলেন। কালো মত, মোটা, মাথায় চুল কম। কালো ব্ল্যাক বোর্ডে চক দিয়ে লিখলেন, টু ডে ক্যাশ, টুমরো ক্রেডিট। লিখে ঘুরে দাঁড়ালেন। এরা সবাই ইংরেজিতে পড়ান। স্যারদের কথা বুঝতে দিপুর সমস্ত মনোযোগ একাগ্র করে রাখতে হচ্ছে। আর মনে মনে ফেলে আসা স্কুলের ক্লাসের সাথে , মিলিয়ে নিচ্ছে পার্থক্যগুলো। কলেজের স্যারদের সাথে , স্কুলের স্যারদেরও তুলনা করছে মন। স্কুলে তো বিজ্ঞান যিনি পড়াতেন, কোনও ক্লাসে তিনিই অংক করাতেন। এখানে তা নয়। বায়োলজির আবার দু’জন স্যার। একজন জুলোজি পড়ান, অন্যজন বোটানি। অংক পড়ান চার জন স্যার। সেদিন যিনি অংক পড়াতে এলেন, কে যেন বলল, উনি খুব ভালো পড়ান। সঙ্গে সঙ্গে দিপুর মনে পড়ে গেল , স্কুলের তারা শঙ্কর স্যারের কথা। স্কুলে স্যার একবার বুঝিয়ে দিলে মাথায় গেঁথে যেত। ট্রিগনোমেট্রি পড়ানোর সময় স্যার একটা টোটকা শিখিয়ে ছিলেন। সাম পিপল হ্যাড কার্লি ব্ল্যাক হেয়ার টার্নড পারমানেন্টলি ব্রাউন। কলেজে এখন যিনি পড়াচ্ছেন, তিনি আর তারা শঙ্কর স্যারকে হারাতে পারলেন না। লিমিট এক্স টেনডস টু জিরো, হুইচ ইজ ভেরি নিয়ার টু জিরো, বাট নট ইক্যুয়াল টু জিরো। এই গোলোকধাঁধায় ঢুকে দিপুর মাথা একেবারে ঘেঁটে গেল। যেন সে গোবরে পা পিছলে পড়ে গেছে, বদরপুরে যা প্রায়ই হত তার সাথে। ওখানে প্রচুর গরু রাস্তায় ঘুরত। সুধীর স্যারের কথা মনে পড়ে গেল। স্যার কাউকে বকতে হলে প্রায়ই বলতেন, রাস্তার গরু। যেন ওটাই সব চেয়ে হীনতম তুলনা। স্যারকে ভালবাসতে শুরু করে , যখন জানল, স্যারের ছোট ভাই নকশাল আন্দোলনে মারা যায়, পুলিশের গুলিতে। স্যারের কড়া নজর থাকত, যাতে ওরা নকশাল রাজনীতির সংস্পর্শে যেতে না পারে। বড় ক্লাসে ওঠার পর অনুভব করতে পারত স্যারের মমতা। স্যারের বাইরেটা যত কঠিন, অন্তরটা ততই নরম। ম্যাট্রিকের ফল বেরনোর পর, স্যারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করার পর, স্যার যে মাথায় হাত বুলিয়েছিলেন, সেই স্পর্শে মমতার সজলতা মিশে ছিল, যা পরমাত্মীয়ের স্পর্শে পাওয়া যায়।
বদরপুরের কলোনি-জীবনের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে, কখন যে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল, টেরই পায়নি দিপু। সম্বিত ফিরল, ক্রিং করে ক্লাস শেষের বেল বাজতে। স্যার ডাস্টার, রোল কলের খাতা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। আর সেদিন দিপু যেটা বুঝতে পারেনি, সেটা তার এক অবশ্যম্ভাবী নিয়তির ইসারা। লাগাতার ক্লাস চলছিল। দিপু জানত না রুটিন কোথায় পাওয়া যায়। অনেকেই রুটিন লিখে এনেছিল। ওদের কাছ থেকে লিখে নিতে পারে। কিন্তু, দিপু এবার যেন নিজেকে নতুন করে চিনতে পারছে। সে টের পায়, চট করে মেশার ক্ষমতা তার নেই। তার মধ্যে একটা নিভৃতচারী মন লুকিয়ে ছিল। কেউ বলল, অফিস রুমের নোটিস বোর্ডে রুটিন আছে। সেও নীরবে ওদের অনুসরণ করে। জালের আড়ালে আঠা দিয়ে সাঁটা রুটিন খাতায় লিখে নিল। তার মানে আজ পরের ক্লাস তিনটে পঁয়তাল্লিশে। ক্লাসের উল্টো দিকে একটা চা- বিস্কুটের দোকান আছে। খিদে পেয়েছে। অনেকের মত, সেও এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট নিল। চায়ের নেশা তার নেই। বাড়ীতে তাকে চা খেতে দিতেন না মা। সে খেতো দুধ। এখানে নিষেধ করার কেউ নেই। নিষেধ ভাঙার মধ্যেও আনন্দ আছে, এটা তো জানত না! চায়ে চুমুক দিয়ে বিস্কুটে কামড় বসিয়েছে, এমন সময় কানে এল, একটা ছেলে বলছে, এই কলেজে তো শক্তিপদ ব্রহ্মচারী পড়ান। আমাদেরও ক্লাস পাবেন। নামটা শোনা মাত্র শিহরিত হয় কর্ণকুহর। নামটা তো চেনা। বাড়ীতে ‘অমৃত’ আসত। ওতে শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা পড়েছে। সে ভাবত , উনি নিশ্চয় কলকাতার কবি। ছাপার অক্ষরে যার নাম পাওয়া যায়, তাঁকে চোখের সামনে আগে কখনো দেখেনি। শেষ ক্লাস বাংলা। সেই ছেলেটাই আবার বলল, আজকের বাংলা ক্লাস এসপিবি আসবেন। শোনামাত্র শিহরিত হয় পুনর্বার। মাঝের বোটানি ক্লাস সেই পুলকে মাঠে মারা গেল। তাছাড়া, স্যারের পড়ানোর ধরনটাও বেশ অন্যরকম। বাংলা ক্লাসে যিনি এলেন, ধুতি পাঞ্জাবী পরা। ভীষণ শ্রুতিসুখকর তাঁর বলার ধরন। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। উনি পড়াচ্ছেন, চন্দ্রগুপ্ত। দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের নাটক। আর প্রথম ক্লাসেই উনি বুঝিয়ে দিলেন, যে উনি আমর্ম রবীন্দ্রানুরাগী। পড়াচ্ছেন দ্বিজেন্দ্র লাল, কিন্তু বাক্যে বাক্যে সমালোচনা করছেন নাট্যকারেরই। আর প্রতিতুলনায় উদাহরণ হিসেবে অনর্গল উদ্ধৃত করে যাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। এত ভালো বাংলা ক্লাস দিপু স্কুলে পায়নি। মনে মনে সকলেই ধরে নিয়েছে, উনি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী না হয়ে যান না। ক্লাস শেষ হল। সকলে যখন প্রায় নিশ্চিত, তবু জিজ্ঞেস করে উঠল, স্যার আপনার নামটা কি ? একমাত্র উনিই ক্লাসে এসে নিজের নাম বলেননি। প্রশ্ন শুনে, একটু দাঁড়ালেন। বললেন, লিখে রাখো, জেআরসি। পুরো নামও বলেননি। শুধু ওই জেআরসি। যে ছেলেটি প্রত্যয়ের সাথে বলেছিল, আজ শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ক্লাস হবে আজ, সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন হেসে উঠল। দিপুও একটু হতাশ হল। ছাপার অক্ষরে দেখা নামের কবির দেখা পাওয়া গেল না। কবির জন্যএই এক-দেড় ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত প্রতীক্ষাও যে তার জীবনে আরেক অবশ্যম্ভাবী নিয়তির ইসারা, দিপু টের পেলো না।
( চলবে )
।।৮।।
স্মৃতি
দিনগুলো মাঝেমাঝে কিরকম যেন আবছায়াতে ভরে যায়। তখন সবকিছু বোধের আড়ালে চলে যায়। সম্পর্ক, মানুষ, চেনা হাত, কমলা রঙের আঁচল, চোখ,--সব কিছু জটিল ধাঁধার মতন মনে হয় শুধু। সমস্ত পথের মুখে আগল পড়ে থাকে। গোলকধাঁধার ভিতর, ঘুরে ঘুরে ক্লান্তি আসে।অবসন্ন বোধ হয়, নিভে যায় চেতনার আলো। অনেক রাত অবধি ঘুম আসে না। ধরা যাক, প্রবল গ্রীষ্ম। টিনের চালের গরম, সিলিং ফ্যানের হাওয়ায়,সমস্ত শরীরে, আরও তপ্ত হলকা ছুঁইয়ে দিচ্ছে। গ্রীষ্মের একটি অনবদ্য বিবরণ লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। এক গ্রীষ্মে দুই কবি প্রবন্ধে। বাইরে কাক ডেকে উঠল। পূর্ণিমার রাতে , কখনো শোনা যায় কাকের ডাক। আগে কত রাতচরা পাখি ছিল। এখন সেসব নেই। কুউউহ,কুউউহ তীক্ষ্ণ সুরে, এক রকম পাখি ডাকত। সম্ভবত, কোনো প্রজাতির প্যাঁচাই হবে হয়তো। ডাক শুনলে, কেঁপে উঠত বুক। মা আগুন জ্বেলে সর্ষদানা পোড়াতেন। ওটা ডাকলে নাকি অমঙ্গল আসে। শূন্য রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ী প্রচণ্ড গতিতে চলে গেল। পাশের খাটে দাদা ঘুমোচ্ছে অঘোরে। খাট না বলে, চৌকি বলাই ভালো। খাট বললে যে ছবিটা মনে ভেসে আসে, এর সাথে দাদার খাটের কোনো সাদৃশ্য নেই। সদরঘাটে সস্তার কাঠ চিঁরে, পেরেক ঠুকে বানানো চারপেয়ে খাট। মাশারি লাগানোর খুঁটি নেই। আর এইসব খাটে কোনো বার্নিশ থাকে না। কয়েক মাস পর পেরেক গুলো ঢিলে হয়ে গেলে, খাট নড়ে ওঠে, বসলে বা শুতে গেলে। আমার খাট অবশ্য পুরনো। দাদুর আমলের। প্রতি বছর বাবা মিস্ত্রি ডেকে বাড়ীর সব আসবাবের সাথে, এই খাটও বার্নিশ করান। দাদার অবশ্য খাট নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। সেটা আমাদের বাড়ীর পারম্পরিক সহবৎ বোধ। বড়রা ছোটদের জন্য ত্যাগ করবে। আমাদের বাড়ীর অনেক শরিক। দাদু কোন খেয়ালে , কে জানে, কলকাতার পাশে বারাসতে এক লপ্তে সস্তায় অনেকটা জমি কিনে ফেলেছিলেন। সেই বসতবাটিতে আমার কাকা-জ্যাঠারা চলে যান। দাদুর এক ভাই স্বদেশী রাজনীতি করতেন। জেল খাটেন। জেল থেকে যখন বেরোলেন, তখন তিনি কম্যুনিস্ট হয়ে গেছেন। কম্যুনিস্ট পার্টি তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে পাঠিয়ে দেয়। পার্টির কাজের ফাঁকে, পড়াশোনা করে বি এ পাশও করেন। আমরা তাঁকে বড় দাদু ডাকতাম। সেই দাদুও কলকাতায় বসত গড়েন। হয়তো বড় দাদুর টানেই আমার ঠাকুর্দা কলকাতায় একটা বসত গড়েন। আমার বাবারা পাঁচ ভাই, এক বোন। জ্যাঠা-কাকারা পড়ার জন্য কলকাতা গিয়েছিলেন। বাবা সবার ছোট। দাদু বাবাকে কলকাতা যেতে দেননি। সে নিয়ে বাবার দুঃখ আজও যায়নি। কলকাতায় পড়ার সময় , বড় দাদু ছিলেন ওদের অভিভাবক। বড় দাদু মাঝেমধ্যে আমাদের শিলচরের বাড়ীতে আসতেন। তবে সেটা পার্টির কাজে। খুব আমুদে মানুষ ছিলেন। আমার চোখে বড় দাদু মহানায়ক। স্বদেশী করেছেন, জেল খেটেছেন।বড় হয়ে যখন ‘পথের দাবী’ পড়ি, বড় দাদু তখন আর নেই, আমার মনে ভেসে উঠত , বড় দাদুর মুখটা। স্বদেশী আন্দোলনের ইতিহাসের প্রতি আমার যে দুর্মর আকর্ষণ, তা বোধহয় বড় দাদুর প্রতি টান থেকেই । বুঝতে চাইতাম , কেমন ছিল ওদের সময়টা। কেন একজন মানুষ , আর দশজন মানুষের মত, সংসারের সাধ আহ্লাদে ভেসে না গিয়ে, সন্ন্যাসীর মত, একটি দুর্গম , বন্ধুর পথে হেঁটে গেলেন, সারাটা জীবন। দেখেছি, বড় ঠাকুমা, জ্যাঠারা খুব সাধারণ জীবন যাপন করে গেছেন। বড় দাদুর দিকের বড় জ্যাঠা, পারিবারিক রাজনীতির সুবাদে, বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ট্রেড ইউনিয়ন করতেন। কিন্তু জীবন ছিল বড় সাদামাটা। ক্ষমতা , রাষ্ট্রশক্তি, কিছুই বদলাতে পারেনি বড় জ্যাঠাকে। জ্যাঠা কোনোদিন রাষ্ট্র শক্তির ক্ষমতার কাছে, হাত পেতে, ভিক্ষা নিতে পারেননি। জ্যাঠার দল ক্ষমতায় এসেছিল। দলের উপরতলা থেকে, দলের সাধারণ ক্যাডার, সকলকেই চিনতেন। তবু জ্যাঠা , দলের অধিকৃত রাষ্ট্র-ক্ষমতার বলয়কে অস্বীকার করে, নিজের চারপাশে, আরেকটা অলঙ্ঘনীয় বলয় তৈরি করে নিয়েছিলেন। সেটা ভেদ করে জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার সহজ লালসা, তাঁর মনে বাসা বাঁধতে পারেনি। আমার জ্যাঠতুতো দাদারা সেই অর্থে অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনই যাপন করে আজও। কোনো ছেলের জন্য চাকরীর উমেদারী করেননি দলের নেতাদের কাছে। আজ বুঝি, আমাদের বংশধারায় তীব্র আত্মসম্মানবোধের পরম্পরা, বাহিত হয়ে চলেছে। অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ানো আমাদের ধাতে নেই। আর তাই জন্যই বাবা , সরকারী আদেশের প্রতিবাদে বিনা বেতনে , দীর্ঘ পনেরো মাস আদালতে কেস লড়েছিলেন, সেই অন্যায় সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে। বাবার কাছের মানুষরা বুঝিয়েছিল, এসব করো না। যদি চাকরী চলে যায়। বাবা নীরবে হেসেছেন। চলে গেলে চলে যাবে। এদিকে ঘরে নাই টাকা। বাবা চললেন, কলকাতা। যাবার আগে আমাকে বলে গেলেন, পূর্ণ পালের দোকানে বলা আছে। যা চালডাল লাগবে, যেন বাবার নাম করে নিয়ে আসি। ইটখোলার এক শব্জিওয়ালা বাবার ছাত্র। আমাকে নিয়ে গিয়ে ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বাকী বন্দোবস্ত। মাছওয়ালার সাথে পরিচয় হল। সেখানেও বাকী বন্দোবস্ত। তখন তো জানতাম না, বাবা ফিরবেন কোর্টের রায় বেরনোর পর, পনেরো মাস কলকাতায় কাটিয়ে।
ঘুম তো আসছেই না। এই রোগটা খুব সাম্প্রতিক। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা কোমল সরু হাত, যে হাত ধরিনি কখনো। মনেমনে ধরেছি প্রতিদিন, দেখা হলেই। চশমার আড়ালে উজ্জ্বল দুটো চোখ। হাসিতে ঝর্নার কুলুকুলু ধ্বনি। মিঠু,আমার বন্ধু,তারই খুড়তুতো বোন। স্বাতী। বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে ক্লাস এইটে ভর্তি হয়। অত্যন্ত মেধাবী। ওর আসল নাম ছিল, ভাস্বতী। এডমিট কার্ডে ভুলবশত ওর নাম হয়ে যায়, স্বাতী। ডাকনাম , ফুল। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কি ফুল ? ও বলে, তা তো জানিনা। সেই দিনটাতে ওকে , গাড় স্বরে ডেকেছিলাম, জুঁই। ও মর্মছোঁয়া চোখে তাকায় , আমার চোখে। পলকের মুহূর্তটি ভেঙে গেল, মিঠুর মা আসায়। তবু মুহূর্তটি ভেসে রইল , তরঙ্গের মত , ইথারে ইথারে। বুকের ভিতরে, স্মৃতির গহীনে। হানা দিচ্ছে, ঘা দিছে, রক্তাক্ত করে দিচ্ছে অন্তর-বাহির। আর নিভে যাচ্ছে, চেতনার আলো। আলো জ্বালাবার সুযোগ থাকলে, বই পড়া যেত। কাল বাবার টেবিল ল্যাম্পটা আনতে হবে। বাথরুমে গেলাম। চোখে মুখে জল দিলাম। বাইরে পূর্ণিমার আকাশ। নক্ষত্রে ভরা এক রাত। এর মাঝে কোনটার নাম, স্বাতী ?
( চলবে)
।। ৯ ।।
একটি নতুন অভিজ্ঞতা
বাবলুর পোস্টকার্ড এল। নতুন কলেজ খুব ভালো লাগছে। গৌহাটি টইটই করে ঘুরছে। দিপু কখনো গৌহাটি যায়নি। শুনেছে খুব বড় শহর। শিলচরের চেয়ে অনেক বড়। অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে। ও এখন অনেকটা অসমীয়া শিখে নিয়েছে। দিপু স্কুলে বাধ্য হয়ে অসমীয়া বই পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু বলতে পারে না। বাবলু ওকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। বাবলু মিশুকে। ওর বন্ধু জোটাই স্বাভাবিক।বাবলুর চিঠিতে কত জায়গার নাম,- ফ্যান্সি বাজার, পল্টন বাজার, লাখটকিয়া, ভরালিমুখ। ওখানে সে সিটিবাসে কলেজ যায়। ও থাকে গোসাবায়। বেশ কিছুদিন কেটেছে নানা জায়গা ঘুরে। উমানন্দ শিব বাড়িও ঘুরে এসেছে। মাঝে এক শনিবার কলেজ বন্ধ ছিল। অরূপ কলিতা বলে এক সহপাঠীর সাথে ঘুরে এসেছে কাজিরাঙ্গা অভয়ারণ্য। বাঙালি ছেলেদের নাম অরূপ হয়। কিন্তু কলিতা টাইটেলটা এই প্রথম জানল দিপু। একটা চিঠিতে বাবলু লিখেছে, বেড়াতে তার ভালো লাগে। তার মধ্যে যে একটা ভ্রমণ-পিপাসু মন আছে, আগে তা অনুভব করেনি। আসলে, স্কুলের শৃঙ্খল যতদিন ছিল, ততদিন , মন ডানা মেলতে পারেনি, স্বাধীন ইচ্ছার আকাশে। কলেজের অর্থ যে মহাবিদ্যালয়, সেটা দিপুও আজ অনুভব করতে পারছে, তার নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বাবলুর চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওর এখন এক দঙ্গল বন্ধু- বান্ধব । কেউ বেজবরুয়া, যেমন গৌরব বেজবরুয়া, রাজেশ তামুলি, দীপেন গোঁহাই। এই টাইটেল গুলো আগে জানত না দিপু। কিন্তু নামগুলো বেশ বাঙালী-বাঙালি।বাবলুর অধিকাংশ বন্ধুই এখন অসমীয়া। ওর চিঠি পড়লে বোঝা যায়, ও একটা নতুন দুনিয়ার, স্বপ্নের মত দুনিয়ার ঠিকানা পেয়ে গেছে। যত দিন যেতে লাগল, বাবলুর চিঠির সংখ্যাও কমে আসতে লাগল। দিপু ভাবে, হয়তো, পড়ার চাপে। শেষে নববর্ষ, আর বিজয়ার শুভেচ্ছার চিঠিতে এসে থামল। দিপু, যদিও মিশুকে নয়, তবু , তারও কিছু নতুন বন্ধু হয়ে গেছে। পড়ার চাপও বাড়ছে। কলেজে একটা লাইব্রেরী আছে। কত বই। রেল ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরীর থেকে অনেক বড়। কার্ড দিয়ে দুটো বই নেওয়া যায়। ক্যাটালগ দেখে বই নিতে হয়। দিপুর আকর্ষণ সাহিত্যে। কিছু লেখকের নাম তো স্কুলপাঠ্য বইয়ের সুবাদে জানা যায়। কিন্তু এর বাইরে যে আরো কত লেখকের নাম যে সে জানত না, বুঝতে পারল , কলেজের বইয়ের ক্যাটালগ দেখার পর। একদিন তো শুধু নাম পড়েই কাটিয়ে দিল। সারি সারি কাচের পাল্লা দেওয়া আলমারিতে বই রাখা আছে। কাগজে বইয়ের নাম, আর একটা নাম্বার লিখে জমা দিলে, তাও দুপুর দু’টোর মধ্যে, পরের দিন বই পাওয়া যায়। চটইদা, নামটা অন্যদের মুখ থেকে শোনা, বেঁটে খাটো, রোগা-পাতলা, মজার মানুষ, উঁচু টুলে চড়ে, আলমারি থেকে বই নামান। কিন্তু ভেতরে ঢোকা বারণ। একদিন ক্যাটালগ দেখছে মন দিয়ে, এমন সময় , কে যেন পাশ থেকে বলল, এই বইটা পড়েছ , বলে আঙুল দিয়ে বইয়ের নামটা দেখাল। লেখকের নাম অজানা, বইয়ের নাম ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’, লেখক বুদ্ধদেব বসু। দিপু ছেলেটার দিকে তাকায়। ওরই মামার বাড়ীর ওদিকে থাকে। দিপু বইটার রিকুইজিশন দিল। ওর নাম সারথি দত্তগুপ্ত। বাড়ী নূতন পট্টি। যেভাবে বইটার কথা বলল, লেখকের সম্পর্কে বলল, বোঝা যায়, পড়ুয়া ছেলে। ঢ্যাঙা মত লম্বা, এই বয়সেই মাথায় চুল কম। প্রচুর কথা বলে। ওর অনেক কথাই নতুন লাগে দিপুর। এসব নিয়ে ,আগে কখনো ওর কথা হয়নি কারো সাথে। তবে বইয়ে পড়েছে। সেই প্রথম আলাপেই, সারথির সাথে সম্পর্কটা জমে গেল দিপুর। ভালো লেগে গেল সারথিকে। দিপুর মামার বেশ নামডাক আছে। নাম বলতেই সারথি চিনে গেল। সারথিই বলল, রোববারে ডিসট্রিক্ট লাইব্রেরী নিয়ে যাবে। ও প্রতি রোববার যায়। প্রথম দিন ডিসট্রিক্ট লাইব্রেরী ঢুকেই, মনে মনে বদরপুরের ইনস্টিটিউট লাইব্রেরীর সাথে তুলনা করতে লাগল। তিনগুণ বই এখানে। কত পাঠক। অথচ চারদিক নিঃশব্দ। অথচ ইনস্টিটিউট লাইব্রেরীতে খুব চেঁচামেচি হত। কেউ ক্যারম খেলছে। কেউ গল্প করছে। এখানে সবাই নিঃশব্দে পড়ছে। দিপুর অবস্থা বুভুক্ষু মানুষকে প্রচুর খাবারের সামনে ছেড়ে দিলে যেমন হয়, তেমনি। কত রচনাবলী, যাদের একটা লেখা বাংলা পাঠ্য বইয়ে থাকত, তাঁদের। সারথি ওর হাতে তুলে দিল একটা রচনাবলীর খণ্ড। প্লাস্টিকের মলাট দেওয়া, পরে জেনেছে, ওটাকে বলে জ্যাকেট, বই আগে দেখেনি। সবুজ কভার। উপরে লেখকের হাতের লেখা নাম। সৈয়দ মুজতবা আলী। প্রথম লেখাতেই মজে গেল দিপু। আগে তো পড়া দূরে থাক, নামই শোনেনি। সাতটায় বন্ধ হয় লাইব্রেরী। বইটা তাকে রেখে, হেঁটে চলল মামার বাড়ী। দু’গলি আগে নেমে গেল সারথি। সোমবারে দেখা হবে ওর সাথে। মাথায় ঘুরছেন মুজতবা আলী।
সোমবার কলেজে হুলুস্থুল।কলেজ মজলিশ নির্বাচন হবে। শনিবারেও শান্ত ছিল কলেজের পরিবেশ। একদিনের ব্যবধানে বদলে গেছে, পুরো পরিবেশ। একদল ছেলে, এরা অনেকেই কলেজের নয়, শ্লোগান দিতে দিতে কলেজে ঢুকল। শ্লোগানটা চেনা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। লাল সেলাম,- এটাও শোনা। বদরপুরে থাকতে প্রায়ই শুনত। শ্লোগান দিয়ে দলটা গোটা কলেজ চত্বর ঘুরল। এরপর ক্লাসে ক্লাসে ঢুকল। ক্লাস তো বন্ধ হয়নি। একটা ক্লাস শেষ হয়, আর পরের ক্লাসের স্যার আসার ফাঁকে ওরা ঢোকে। দিপুদের ক্লাসেও ওরা এল। মনে মনে এই মুহূর্তটার জন্যই যেন প্রতীক্ষায় ছিল দিপু। কেন ছিল, হয়তো জানে না। স্রেফ কৌতূহল থেকেও হতে পারে। স্কুলে তো এসব দেখেনি। কলেজে যে নির্বাচন হয়, তাও আবার অনেকটা সাধারণ নির্বাচনের মত, জানতই না। তাও আবার রাজনৈতিক দলের মত শ্লোগান দেওয়া, একেবারে অভাবিত। নাকি ওর চেনা শ্লোগানগুলো ওকে উৎসুক করে তুলেছিল, মন চাইছিল,ওদের ভালো করে দেখতে ? রক্তে কি অজানা কোলাহল জেগেছিল অজান্তে ?
যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে স্যারেরা লেকচার দেন, ওতে কয়েকজন ছেলে উঠে দাঁড়াল। ওদের মধ্যে একজন দেখামাত্রই চোখ টেনে নেয় চুম্বকের মত। ফর্সা, লম্বা কোঁকড়া চুল দাড়ি, উজ্জ্বল মায়াময় চোখ। একজন পরিচয় করিয়ে দিল। জরুরী অবস্থায় জেলে ছিল। শোনামাত্র দিপুর রক্তে আবেগের কলরোল শুরু হয়ে গেল। এইসবই ওর চেনা ঘটনা। জরুরী অবস্থায় বাবার সহকর্মীদের কাউকে কাউকে, যারা ওর খুব কাছের, কাকু-জেঠু বলে ডাকে, ওদের পুলিশ জেলে নিয়ে গেছে। সেই মানুষটি এবার বলতে শুরু করলেন। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সেই কথাগুলো শুনছে গোটা ক্লাস। কথাগুলো নতুন কিছু নয়। আবার নতুনও। কিন্তু মানুষটার সহজ সরল কথা, দিপুর মন কেড়ে নিল। মানুষটার কথা শেষ হল ইনকিলাব জিন্দাবাদ, এস এফ আই জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে। আর মানুষটার বলা শেষ হতেই, পাশের ছেলেরা শ্লোগান তুলল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, এস এফ আই জিন্দাবাদ, কমরেড অরূপ চৌধুরী লাল সেলাম। গোটা ক্লাস গমগম করছে। ওদের ক্লাসের কিছু ছেলেও সেই শ্লোগানে গলা মেলালো। দেখতে দেখতে ওদের গলাতেও সংক্রামিত হচ্ছে শ্লোগান। দিপুও এই প্রথম গলা মেলালো রাজনৈতিক শ্লোগানে। এই প্রথমবার সে উচ্চারণ করল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
( চলবে)
।।১০।।
স্মৃতি
বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে ? যেন অতিদূরে, কোথাও, আকাশ-ভাঙা বৃষ্টিতে ধুয়ে, ঝাপসা হয়ে আসছে গাছপালা, ঘরদোর, কাচা-ভাঙা পথ, ঝাউ গাছ ও দেবদারু বীথি, বড়ই গাছ, সবুজ কচি লেবু পাতা, কলা বাগান, সুপুরির বন, হাওরের জলে ভেসে চলা শূন্য নৌকা, যে হাওর তখন উথাল-পাথাল, ঢেউয়ে-ঢেউয়ে অস্থির,উত্তাল ,আর হিজলের গাছগুলো, হাওরের জলে দাঁড়িয়ে, মাথা নেড়ে চলেছে অবিরত ; বাস্তবিকই, ঝাপুস বৃষ্টিতে,আমি দেখেছিলাম, চারচর, এরকম ঝাপসা হয়ে আসতে ; ধলাই গিয়েছিলাম পার্টির কাজে। আচমকাই আসে বৃষ্টি। একটি অচেনা বাড়ীর মাটির দাওয়ায় বসে, প্রত্যক্ষ করি আমি, বৃষ্টির তুমুল উচ্ছ্বাসে, কিরকম ঝাপসা হয়ে এলো, আদিগন্ত ধলাই গ্রাম, যতটুকু দূরে চোখ যায়, যেন নন্দলাল বসুর আঁকা জলরঙ ছবি, স্নিগ্ধ, স্মিত,প্রকৃতির সেই স্বরচিত ছবিখানি, দেখেছিলাম আমি। গৃহস্থ আমাকে এক বাটি নুন-চা, আর মুড়ি দিয়েছিলেন সাথে। এইসব অলৌকিক দৃশ্য দেখে না যারা, জন্মান্ধ,চির বঞ্চিত তারা। বৃষ্টি তো হচ্ছে না ! টিনের চালে কোনো শব্দ নেই, বৃষ্টি হলেই, যা, মন আমার, আবিষ্ট করে ফেলে। তবে এটা ফ্যানেরই শব্দ। বনবন করে ঘুরে চলেছে। এবার নভেম্বরের শুরুতেই, হিম পড়ে গেল। আমি প্রবল শীত-কাতুরে। এই নিয়ে স্বাতী কত ঠাট্টা করে। আমি এখনই কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুই। দাদা শুধু বেডকভার নিয়ে শোয়, যদি ঠাণ্ডা লাগে ভোরে, গায়ে দেবে। ওটা ওর পাশে লম্বালম্বি ভাঁজ করা থাকে। যাতে, ভোরের ঘুম চোখে, চোখের পাতা না খুলেই, টেনে নিতে পারে চাদরখানা। তবু ওকে ফ্যান চালিয়ে ঘুমোতেই হবে। এটা চলবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ অবধি। আবহাওয়া বদলে গেছে। হিম-লাগা শীতের পরিধি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে দ্রুত। অথচ আমার মনে আছে, লেপের নীচে শুয়ে, রেডিওতে মহালয়া শুনেছিলাম। বাবার সেই ছোট্ট হাত রেডিও। মহালয়ার আগের দিন বাবা নতুন ব্যাটারি কিনে আনতেন। এভারেডি । নতুন ব্যাটারি লাগিয়ে, মাথার বালিশের পাশে, ছোট্ট টুলে, যেটায় তাঁর পেতলের জলের গ্লাস থাকত, প্লেট দিয়ে ঢাকা, আর থাকত হাত ঘড়ি,ফেভরল্যুবা, এক খুড়তুতো দাদা ইঞ্জিনিয়ারের চাকরী পেয়ে , বাবাকে উপহার দিয়েছিল। বড় যত্ন করতেন ঘড়িটাকে। হাত থেকে খুলে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছতেন। সুইস ঘড়ি। আমরা বলতাম, ফেভারলুভা। সেই ছোট্ট টুলের উপর থাকত একটা গোল মত এলার্ম ঘড়ি। ওটার মাথায় গোল একটা বোতাম ছিল। এলার্ম বন্ধ করতে হলে, ঘড়ির মাথায় লাগানো বোতামে, থাবা মারতে হত। ছোটবেলা এলার্ম বাজিয়ে ওটার মাথায় জোরে থাবা মারা ছিল আমার প্রিয় খেলা। তখন আমরা ছোট ছিলাম। এলার্ম ঘড়ির প্রয়োজন কালেভদ্রে পড়ত। বাবা তাই ওটা আলমারির উপর উঠিয়ে রাখলেন, আমার নাগালের বাইরে। কিন্তু বাবা স্কুলে চলে গেলে , আমি মায়ের আঁচল ধরে কান্না জুড়ে দিতাম, ঘড়িটা নামিয়ে দেবার জন্য। ওই বয়স থেকেই আমি ছিলাম প্রচণ্ড নাছোড়বান্দা ; আর যতক্ষণ না ঘড়ি হাতে পাচ্ছি, ক্রমাগত কেঁদেই চলতাম, কেঁদেই চলতাম। আমার মায়ের মত সহনশীল নারীও, অতিষ্ঠ হয়ে ঘড়িটা নামিয়ে দিতেন। আরা বাবা আসার আগে, ওটা জায়গামত তুলে রাখতেন। এটা ছিল মা আর আমার মধ্যে একটা নীরব বোঝাপড়া। একদিন এলার্ম দেবার চাবিটাই ভেঙে ফেললাম। মা সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলেন। বাবা কিন্তু সব বুঝেও আমাকে কিছু বলেননি। ঘড়িটা সারাতে দিলেন। তারপর এনে, আলমারিতে তালা মেরে রেখে দিলেন। যেদিন এলার্ম দেবার প্রয়োজন হত, সেদিন বের করতেন আলমারি খুলে। সেই ঘড়িটা আজ আর কোথায়, ঘরের কোন ঘুপচিতে পড়ে আছে, জানি না। সময়ের মত ঘড়িও হারিয়ে যায়। দাদা অকাতরে ঘুমোচ্ছে। আমার কেন যে ঘুম আসছে না আজ। এতোল-বেতোল কি সব ভাবছি। আবার শীত লাগছে আমার। শীত লাগলেই আমার মনে পড়ে যায়, স্বাতীর সেই হাসি, যা সে হেসেছিল আমার মাথায় মাঙ্কি টুপি দেখে। একা পেলে ওকে ডাকি, স্বাতীফুল। আমার মনে হয়, এটাই প্রকৃত নাম ওর। আকাশের নক্ষ্ত্র যেন নেমে আসে, মাটির উপর। এই সময় প্রচুর ফুল ফোটে আমাদের বাড়ীতে। মায়ের একটাই শখ,বিলাসিতা,-- ফুল গাছ লাগানো। যার বাড়ীতে যে ফুল দেখেন, একটা চারা এনে লাগান। গোবর দেন। জল দেন। চারপাশে মাটি খুঁড়ে দেন। মার কোনো খুরপি নেই। একটা পুরনো রান্নার ছেনি দিয়ে মাটি খোঁড়েন। খুব সুন্দর করে , বাগান করেন। যখন ফুল ফোটে, মায়ের মুখ আলো করা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমাদের সকলকে ডেকে ডেকে দেখান, আয়, দেখে যা, জুঁইটা ফুটেছে। দেখে যা, গাঁদা ফুটেছে। মল্লিকা ফুটেছে। শুধু শিউলি ফুটলে দেখাতেন না। ওর সৌরভে সারা উঠোন ম ম করত। মাকে দেখেছিলাম, এক ভরা জ্যোৎস্না রাতে, ফুলে ভেসে থাকা শিউলি গাছটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছেন। সারাদিন সংসারের কাজ করে, ফুল গাছের পরিচর্যা করাটা, মায়ের চূড়ান্ত বিনোদন। কিছু না করার থাকলেও, কোনো একটা গাছের পাতা বা ডাল ছুঁয়ে দেখতেন। যেন আদর করে কুশল জিজ্ঞেস করছেন। মায়ের বিশ্বাস, গাছ বা ফুলকে ছুঁলে, ওরা অনুভব করতে পারে, সেই স্পর্শ,ভালবাসা,-- যে তাকে পরিচর্যা করে। সত্যিই কি ফুল বোঝে, ভালবাসা ? একদিন ছুঁয়েছিলাম, আঙুল। তর্জনী দিয়ে, আরেক গহীন তর্জনী। সরে যায়নি, তর্জনী। শুধু গভীর হয়েছিল, মধ্যবর্তী নীরবতা। যেন নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাবে। অথবা থেমে গেছে, সমস্ত পৃথিবীর তীব্র কোলাহল। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, পাশের বাড়ীর পুকুরের জলে, স্ট্রিট লাইটের হলুদ আলোর প্রতিবিম্ব, যা বাতাসে কেঁপে কেঁপে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে।
(চলবে)
।।১১।।
বই ও মিছিলের পথ
কলেজে ঢোকার পথেই দিপুর চোখে পড়ে, গোটা কলেজ পোষ্টার-ব্যানারে ছয়লাপ। কলেজটা তো একটা উঁচু টিলার মত জায়গায়। কেউ কেউ তো কলেজ-টিলাও বলে। আসলে জায়গাটার নাম টিকরবস্তি। টিকর শব্দের অর্থ উঁচু স্থান। গোটা শিলচর সমতল হলেও, এই টিকরবস্তিই একমাত্র উঁচু একটি টিলা। এরকম উঁচু জায়গা একমাত্র ডিসট্রিক্ট লাইব্রেরীর সামনে দিয়ে যে রাস্তা গেছে, সার্কিট হাউসের সামনে দিয়ে, সেই জায়গাটা। তবে টিকরবস্তির মত উঁচু নয়। বাড়ী বানানোর জন্য অনেকেই উঁচু দেওয়াল তুলেছেন, যাতে বৃষ্টিতে টিলার মাটি ধুয়ে না যায়। সেইসব দেওয়ালে সাদা রঙ দিয়ে ,তার উপর লাল নীল অক্ষরে কলেজ মজলিস নির্বাচনের প্রার্থীদের নাম লেখা। এদের মধ্যে অনেকেই নির্দল প্রার্থী। দল বলতে শুধু এস এফ আই। সারথির সাথেই আজ কলেজে এসেছে। টিকরবস্তির নীচে, রিক্সা থেকে নেমে, পিচ করা টিলা-পথ বেয়ে উঠতে হয়। কলেজে ঢুকেই দিপু বুঝতে পারে, আজ আর ক্লাস-টাস হবে না। ছোট ছোট রঙিন কাগজে, প্রার্থীদের নাম ছাপা স্লিপ দিয়ে যাচ্ছে ছেলেরা। সারথি বলল, এরা আসলে এন এস ইউ আই-এর ক্যান্ডিডেট। নির্দল নামে দাঁড়িয়েছে। ইমার্জেন্সির ক্ষোভ মানুষের মনে তখনো দপদপ করছে। মনে আছে দিপুর, ইন্দিরা গান্ধী হেরে যাবার খবর রেডিওতে আসার সাথে সাথে কলোনি জুড়ে কত বাজি পুড়েছিল। দিপু নির্দল প্রার্থীদের স্লিপ গুলো দলা পাকিয়ে ফেলে দিচ্ছিল। শুধু এস এফ আই-এর স্লিপ গুলো , পকেটে রাখছিল সযত্নে। এই ক’দিনের আলাপে বুঝতে পেরেছিল,সারথি মনে মনে বামঘেঁষা। ওদিকে অরূপ চৌধুরী ছাত্রদের মুখে মুখে , ক্রমেই আপন হতে হতে অরূপদা হয়ে গেছেন। এস এফ আই ছোট ছোট গ্রুপ মিটিং করছে। সারথি দিপুকেও নিয়ে গেল, এমনই একটি মিটিং-এ। বয়েজ কমন রুমে চলছিল মিটিং। আচমকা কতগুলো ছেলে, মারমুখী হয়ে ঢুকে পড়ল কমন রুমে। ওদের দাবী, এটা কমন রুম। এখানে মিটিং করা চলবে না। মিটিং-এ আসা কিছু ছেলে পাল্টা তর্ক শুরু করল। অরূপদা ওদের থামিয়ে সেই মারমুখী , উত্তেজিত ছেলেদের সাথে খুব শান্ত হয়ে কথা শুরু করলেন। অরূপদা যা বলছিলেন, তা যুক্তির কথা। কিন্তু ছেলেগুলো কোনো যুক্তি মানতে বা শুনতে রাজি নয়। অরূপদা শেষে বলেছিল, তোমরা যদি না চাও, আমরা চলে যাব কমন রুম থেকে। তবে এর ফল কিন্ত তোমাদের জন্য ভালো নাও হতে পারে। সেটা তোমাদের হাইকমান্ডকে জানিয়ে দিও। হাইকমান্ডটা কে, সেটা অনেকেই বোঝেনি। ব্যাপারটা একটা ধাঁধা হয়ে রইল। মারমুখী ছেলেগুলো তখনো দাঁড়িয়ে। অরূপদা বললেন, চলো, কাঁঠাল গাছের তলায়। ওখানেই মিটিং করব আমরা। জি সি কলেজের কাঁঠাল গাছ তলার একটা বিশেষত্ব আছে। গাছের তলাটা পাকা করে বাঁধানো। বৃষ্টি-বাদলা না থাকলে , পাকা করে বাঁধানো চাতালটা ছাত্রীদের দখলে থাকে। কোনো ছেলেকে যদি ঘনঘন কাঁঠাল তলার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা গেলে, অবধারিত তার নামে আওয়াজ ওঠে লুকুদার চায়ের দোকানের আড্ডায়। সঙ্গে হাসির হুল্লোড়। সেদিনও চাতাল ছিল মেয়েদের দখলে। অরূপদাকে সদলে আসতে দেখে, মেয়েরা সসম্ভ্রমে সরে গিয়ে এক পাশে দাঁড়াল। জেল-ফেরত অরূপদা যেন এক রূপকথার নায়ক। একজন মানুষকে ভালবাসায়, শ্রদ্ধায় নায়ক করে তোলা, সিনেমায় যেমন হয়, তেমনই হতে লাগল। যতদিন যাচ্ছে, অরূপদা ছাত্র মহলে জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁতে যাচ্ছে। সেটা কি শুধুই জেল খাটার জন্য ? দিপু ও সারথি একদিন আলোচনা করছিল এ নিয়ে। আসলে অরূপদার মাটিঘেঁষা অমায়িক আচরণ, অরূপদার উজ্জ্বল চোখের দ্যুতি, রসবোধ,-- সব মিলিয়ে সবাই মানুষ অরূপদাকে ভালো না বেসে পারেনি। কাঁঠাল তলায় সবাই জড়ো হল। জয়া বলে একটি মেয়ে একটা গান ধরল। ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না’ ,- সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু গলা উঠল। সমস্ত ঘটনাটা সকলকে এতটাই তাতিয়ে দিয়েছিল , ওখানে যারা ছিল, সবাই গলা মেলালো, সুরে-বেসুরে। দিপুও গাইছে। গানটা জানা ওর। বদরপুরে কত শুনেছে, ছোট থেকেই। গানের পর, অরূপদা সকলকে বলল, কমনরুমের ঘটনাটা, ওদের আচরণ। সারথি লক্ষ করল, সেই মারমুখী ছেলেগুলো দূর থেকে নজর রাখছে। অরূপদা খালি গলায় বলছিল। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে শুনতে পাচ্ছিল না, অরূপদার কথা। ওরা এগিয়ে আসে। কলেজের এক অধ্যাপকও শুনছিলেন, টিচার্স কমনরুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। পড়ে জেনেছিল, ইনিই সেই হাইকমান্ড। কংগ্রেস দলের নেতা। অরূপদার কথা শুনে ভদ্রলোকের মুখ ম্লান হয়ে এল। জমায়েত হওয়া ছাত্রদের আবেগ যে অরূপদার দিকে পুরো ঘুরে গেছে, তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি, হাইকমান্ড অধ্যাপকের।
নির্বাচনের দিন, দাদু কিছুতেই দিপুকে কলেজে যেতে দিতে রাজি ছিলেন না। নির্বাচনে মারামারি হয়, এটা জানতেন। কলেজের হাইকমান্ড-অধ্যাপক আবার দিপুর মামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দাদুও স্বদেশী করার সুবাদে, কট্টর কংগ্রেসি, এ কি বৈপরীত্য। সারথি এসে বাঁচালো। দু’জনে একটা রিক্সা নিয়ে ছুটল কলেজে। ভোট শুরু হয়ে গেছে। এই প্রথম ওরা কলেজে ভোট দিচ্ছে, তা-ই নয়, জীবনেও প্রথম ভোট দেওয়া। পরদিন, বেরোবে ফল। রাতটা কাটল তীব্র উত্তেজনায়। সারথি আর দিপু, পাড়ার কাছে জাহাজ গুদামের পাশে, বরাকের তীরে এসে বসে। সন্ধ্যা নেমেছে। আগে এখানে কত জাহাজ আসত। এখন কালেভদ্রে এক দুটো আসে।
তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল সকালে, কলেজ যেতে হবে বলে। আজ যে ফল বেরোবে। এমন উত্তেজনা ওদের কেন হচ্ছে, নিজেরাই বুজতে পারছে না। বা বুঝতেও চাইছে না। যেন এটা ওদেরই লড়াই। বিকেল হয়ে গেল ব্যালট গোনা শেষ হতে। সমস্ত কলেজ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল লাল আবিরের আভা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। এস এফ আই জিন্দাবাদ। চারদিকে দিপুর এত কালের চেনা লালা পতাকা আন্দোলিত হচ্ছে। মিছিলে মিশে গেল দিপু আর সারথি। সারা শহর ঘুরছে মিছিল। পৌঁছে যাছে মানুষের কাছে, পালাবদলের বার্তা। দিপু কি করে যে ভুলেই গেল, সন্ধ্যে ছ’টার মধ্যে বাড়ী না গেলে, দাদু চিন্তা করবেন। আর ভুলবে নাই বা কেন। দিপু তো নিজের অস্তিত্বই ভুলে গিয়েছিল। জনসমুদ্রের জোয়ারে ভেসে ভেসে সে পৌঁছে যাচ্ছিল, এক স্বপ্নের দেশে।
( চলবে)
।। ১২ ।।
একটি তারায় ভরা রাত
বুদ্ধ যে রাতে মিঠুনের সাথে তাদের বাড়ি গিয়েছিল প্রথম বার, সেটা ছিল পূর্ণিমার রাত। অঘ্রাণের প্রায় শেষ , ডিসেম্বরের শুরুর সপ্তাহ। তার জন্মদিনের দু'দিন আগে। তার মানে সেটা ছিল পাঁচ তারিখ। আর সেবার ,তার জন্মদিনের বাংলা ও ইংরেজি তারিখ মিলে গিয়েছিল। জন্মদিনটা তার মনে থাকে। কিন্তু ঘোষণাটা আসে মায়ের কাছ থেকে। পূর্ণিমা বিগতপ্রায় সময়ে জন্মেছিল বলেই কি তার নাম , বুদ্ধ রাখা হয়েছিল? তার বাড়ির সবকিছুই সৃষ্টিছাড়া। যেমন নাম রাখা। অনেক বন্ধুবান্ধবের পরিবারে দেখেছে, নাম রাখা হয় বাবার নামের আদ্যাক্ষরেরে সাথে মিলিয়ে। তার এক বন্ধুর বাবা ও ভাইদের নাম সংক্ষেপে এন.সি.পাল। শুধু এন.সি.পাল নামে কোনো লেফাফা বা ইনল্যান্ড লেটার এলে ওরা প্রেরকের নাম দেখে নিত। তারপর চিঠি খুলত। বাবার নাম নরোত্তম, ছেলেরা নরেশ, নরেন,নগেন। ডাকনাম অবশ্য আলাদা রকমের, মিল ছাড়া। কিন্তু বুদ্ধর আর কোনো নাম নেই। তার একটাই নাম। পাড়ার এক কাকু স্কুলে ভর্তি করার সময়, ডাকনামটাই বলেছিলেন। বাবার সময় নেই। সেই কাকুকে বলে দিয়েছিলেন, বুদ্ধকে স্কুলে ভর্তি করে দিস। তখনো ওর ভালো নাম রাখার কথা কেউ ভাবেইনি। অঘ্রাণ এলেই মা ঘোষণার মত সকলকে শুনিয়ে বলতেন, বুদ্ধর জন্মদিন তো এসে গেল। যেন সেটা কোনো মহাপুরুষের জন্ম তিথি। বোন আড়াল থেকে ফোড়ন কাটত, বুদ্ধদেবের আবির্ভাব তিথি। বলে মুখ টিপে হাসত। দাদা হাসি লুকোনর চেষ্টা করত গাম্ভীর্যের আড়ালে। বুদ্ধ নিজেও উপভোগ করত এই নির্মল খুনসুটি। তবে মা যে শুধু ওরই জন্মদিনের ঘোষণা করতেন, তা নয়। সবার জন্মদিনই এভাবে ঘোষণা করতেন। আসলে যে সন্তানদের তিনি পৃথিবীতে এনেছেন, তাদের জন্মদিন মায়ের কাছে উৎসবের মত ছিল। যে কোনো আনন্দের খবর সকলকে ডেকে ডেকে বলার অভ্যাস ছিল মায়ের। এই দেখ, কি সুন্দর গোলাপ ফুটেছে ; কিম্বা , দেখে যা , কিরকম হলুদ রঙ ধরেছে গাঁদা ফুলের গাছে। শীতের নরম আলোয়, গাঁদা ফুলের গাছ গুলো, সত্যিই হলুদ আভায় ভরে যেত। অথবা সেই আভা মায়ের মন থেকে ছড়াচ্ছে। মায়ের স্পর্শে সব কিছু স্নিগ্ধ সুষমায় ও লাবণ্যে ভরে যায় ; যাদের মনটা সরল হয়, তাদের সান্নিধ্যে এলে , এই লাবণ্য ফুলের সুবাসের মত অনুভব করা যায়।
মিঠুনের সাথে পরিচয় থেকে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতায় কি করে সম্পর্কটা পৌঁছল, বুদ্ধ এই মুহূর্তে মনেই করতে পারছে না। মিঠুনের পড়াশোনা পাব্লিক স্কুলে, আর বুদ্ধ পড়েছে গভট বয়েজে। গভর্নমেন্ট স্কুল কেউই বলে না। সকলেই সংক্ষেপে গভট বয়েজ, গভট ইস্কুল, কেউ আবার গর গর্মেন্ট ইশকুলও বলে। তবে কৌলীন্যের বিচারে অধর চাঁদ , গভট বয়েজ আর নরসিং স্কুলই সেরা। কলেজ যেন একটা সমুদ্রের মত। নানা স্কুলের, নানা জায়গার ছেলেরা-মেয়েরা এসে জড়ো হয়। যার সাথে আগের পরিচয় নেই, সে হয়ে ওঠে প্রিয় বন্ধু। আর স্কুলে যে ছিল নিত্যদিনের ছায়াসাথি, তার সাথে বেড়ে যায় মানসিক দূরত্ব, অভিমান বাসা বাঁধে, বাবুই পাখীর মত, মনের নিভৃত কোণে। একদিন ছিঁড়ে যায় সম্পর্কের শেষ সুতোটুকুও। বুদ্ধর স্মৃতি প্রখর। কিন্তু ভেবে আশ্চর্য হয়, মিঠুনের সাথে এহেন ঘনিষ্ঠতা কি করে ঘটল! শুধু মনে আছে, কি একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে দেবদূত হলে ওর সাথে দেখা । খুব ভিড় হয়েছিল টিকিট কাউন্টারে। মিঠুন দীর্ঘকায়, প্রচণ্ড বলশালী। এক ঝটকায় কাউন্টারের লোহার গ্রিল ধরে এগিয়ে যায়, আট-দশটা ব্ল্যাকারকে টপকে । বুদ্ধ তখনো পাশে দাঁড়িয়ে। বুদ্ধকে দেখেছিল ও। জিজ্ঞেস করে কোনটা নেব ? মিডল স্টল নিয়ে নিই ? বুদ্ধ মাথা নাড়ে। দুটাকা পঁচিশের টিকিট নিয়ে বিজয়ীর মত বেরিয়ে আসে মিঠুন। মুঠোতে দুমড়ানো মোচড়ানো , দলা পাকানো দুটো গোলাপি টিকিট। সেই প্রথম আলাপ, একসাথে সিনেমা দেখা, সিগারেট খাওয়া ইন্টারভ্যালে।
বিদ্যুৎ ছিল না। চাঁদের আবছা আলো , হলুদ আভা ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে। মিঠুনের বাড়ীর গলিটা বেশ নির্জন। কয়েকটা এঁদো পুকুর পড়ে পথে। সোঁদা গন্ধ আসছে, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, আঁধারকে মহিমান্বিত করা জোনাকির আলো, আর তারা হাঁটছে আর গল্প করছে। তবে সেই গল্পের আদি-অন্ত নেই। আকাশের সাদা মেঘের মত ভেসে ভেসে আসছে কথার প্রসঙ্গ। আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। মিঠুনের বাড়ীর গেট টিনের। গেটের উপর দিয়ে হাত দিয়ে ছিটকিনি খুলতে হয়। বিদ্যুৎ নেই। ঘরে জ্বলছে টেবিল ল্যাম্প আর হ্যারিকেন। বুদ্ধদের মতই টিনের চাল। বেশ বড় জমি নিয়ে বসতবাড়ি। পেছনে পুকুর আছে, বলেছিল মিঠুন। মিঠুনের মা এলেন, দিদি এলো। মিনিদি খুব মিশুকে। প্রথম আলাপেই বুঝেছিল, মিমিদির মনটা ভীষণ সরল । ঝর্ণা মাসীও তেমনই। বুদ্ধ লক্ষ করে ঝর্ণা মাসীও বেশ লম্বা। মিনিদিও তাই। সেজন্যই মিঠুন এত লম্বা, ছফুটের কম তো হবে না। মিনিদি কাকে যেন ডাকল। হ্যারিকেনের আলোয় তো আঁধার ঘোচে না। বরং একটা আবছা রহস্য ঘনিয়ে তোলে। মিনিদি যাকে ডেকেছিল, সে এসেছে। চুড়িদার পরা ছিপছিপে একটি কিশোরী । মিঠুনের খুড়তুতো বোন। বাংলাদেশ থেকে এসেছে। ওখানে সুরক্ষা নেই। তাই। এক মাথা কোঁকড়ানো চুল। টিকলো নাক। থুতনি ধারালো। মিনিদি বলে, ফুল, চা নিয়ে আয়। তারপর পরিচয় করিয়ে দেয়। এখন ক্লাস টেন-এ উঠেছে। ও সেতার বাজায়। আর কণ্ঠস্বরে সেই সেতারেরই ঝঙ্কার।
বুদ্ধ জানত না, এই পরিচয়, এই রাত, তার বাকী জীবনের নিয়তি লিখে দিয়ে গেল। অসুরক্ষিত অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে , যে নিজের দেশ ছেড়ে এসেছে, সে তো সহজে নৌকা ভাসাবে না, আসমানের গতিক না পড়ে, বুদ্ধ জানত না।
( ক্রমশঃ)
।।১৩।।
বন্ধু-বৃত্তান্ত - ১
কলেজে ভর্তি হবার মাস দুয়েকের মধ্যে, যারা থোড়া বহুৎ আড্ডাবাজ, যারা শুধু ভালো ফল করতে চায় পরীক্ষায়, যাদের মাথায় ততোদিনে হরেক ভূত বাসা বেঁধেছে, যেমন কবিতা লেখার ভূত, লিটিল ম্যাগাজিন করার ভূত, সমাজ বিপ্লবের ভূত, প্রেমের ভূত, কারো একলা থাকার ভূত (যেমন সঞ্জীবের কোনো বন্ধু ছিল না এবং পরীক্ষায় অসাধারণ ভালো ফল করে, আই আই টি-তে পড়তে যায়। কিন্তু তার কোনো বন্ধু না থাকায়, সবার স্মৃতি থেকে সে হারিয়ে যায়। শুধু বুদ্ধ তার এক বন্ধু মারফত সঞ্জীবের খবর পেয়ে যেত। সঞ্জীব সংসার পাতে নি। সে নাকি লাখ টাকা বেতনের চাকরী ছেড়ে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী হয়ে যায়। শুনে, দিপু অবশ্য অবাক হয়নি। তার নাকি বরাবরই মনে হত, সঞ্জীবের মধ্যে একটা দার্শনিক প্রজ্ঞা ও দৈব প্রভা আছে ; না হলে, ঐ বয়সের একটা ছেলে এত গম্ভীর থাকতে পারত না), কারো বা নাটকের ভুত,-দেখা গেল, যাদের যেমন ভুতের ভর হয়েছে, তারা ছোট ছোট বৃত্তে জুড়ে গেল, যার নাম বন্ধুত্ব,নিজেদের মধ্যে নিরন্তর সঙ্গ লাভের অদম্য উন্মাদনা ; এমন যেন দেখা না হলে, দিনটি বিরস, বৃথা, অহেতুক প্রলম্বিত , একঘেয়ে, বিরক্তিকর। সেদিন একা পথে পথে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরা, যাকে কখনোই পছন্দ নয়, তার সাথে এক ঘণ্টা কথা বলে, নিজেকে উৎপীড়িত করা। আর যদি পরদিন দেখা হয়ে যায়, সকলের সাথে, বাকী পৃথিবীটা লহমায় মুছে যায়। কাউকে খুঁজে পেতে হলে, শহরের এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হয় হেঁটে। শৈশব- কৈশোরের যে বন্ধুত্ব, তার মধ্যে থাকে শুধু বোধহীন আবিলতা। অপছন্দের, ভালো-না-লাগার কোনো অবকাশ তাতে নেই। শৈশবের অভ্যাসে গড়ে ওঠা,সেই বন্ধুত্বের ফিতেটা একটা বয়সের পর কী করে যেন, বিবর্ণ হয়ে যায়। তখন হঠাৎ দেখা হলে, কি, ভালো তো ? বা মাথা নেড়ে মুচকি হেসে চলে যাওয়া ছাড়া, আর কোনো আবেগ কাজ করে না। আর ভেবে অবাক হতে হয়, একদিন একে ছাড়া বিকেল কাটত না, স্কুল যাওয়া হত না, ডি এস এ মাঠে এন এম গুপ্ত ট্রফির খেলা দেখার কথা ভাবা যেত না ! তবে মনের অনেক গভীরে, যেন কুয়োর গভীরে টলমল করে কালো জল, তেমনি ভালোবাসার বোধ কাজ করে। এই যেমন নন্দুর পক্স হওয়ার খবর পেয়ে, বুদ্ধ ছুটে গেল। দিনরাত ওকে সঙ্গ দিত। পক্স হলে একা থাকতে হয়। তখন একেবারে একা থাকা, ভীষণ কষ্টকর। বন্ধুরা দূরে থাক, বাড়ির লোকজনও কাছে আসতে পারে না। দিনরাত মশারির ঘেরাটোপে শুয়ে-বসে আরোগ্যের প্রতীক্ষা করা, বড় বিরক্তিকর।নন্দুর সেই একঘেয়ে-বিরক্তিকর দিনগুলোতে, বুদ্ধ, প্রতিদিন ওকে সঙ্গ দিয়ে গেছে। অথচ নন্দু সেরে ওঠার পর বুদ্ধ যায়নি ওর বাড়ী আর ।
এরমধ্যে কলেজ মজলিস নির্বাচনে এসএফআই বিশাল জয় পেয়েছে। অরূপদা ভাইস প্রেসিডেন্ট,জসীমউদ্দীনদা জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিত হয়েছে।নির্বাচনের ফল বেরোবার পর কলেজ চত্বর জুড়ে লাল আবিরে রঙিন হয়ে উঠল বাতাস।বেরোল বিজয় মিছিল। সেই মিছিল ঘুরল শহরের আনাচে কানাচে। দিপুও জীবনে প্রথম একটা মিছিলে, আর সবার সাথে , পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটল ; ছোটবেলা রেল কলোনিতে কত মিছিল দেখেছে এমন। দিপু অনুভব করে, ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান দেওয়ার সময়,আমর্ম প্রত্যয় আর তীব্র আবেগ মিশে যায়। সারথি আর দিপু ওদের ক্লাসের সব ছাত্রকে পঁচিশ পয়সার মেম্বারশিপ কুপন বেচে দিয়েছিল। দিপু বা সারথির মত যারা কলেজ-নির্বাচনে এসএফআই-এর হয়ে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছে, অরূপদা একদিন তাদের সকলকে নিয়ে কমনরুমে বসল। এখন আর ওদের বয়েজ কমনরুম থেকে তাড়িয়ে দেবার ক্ষমতা কারো নেই। দিপু তো অরূপদার সরল, অমায়িক আচরণে মুগ্ধ। মিটিং শেষে যেচে নিজে থেকেই আলাপ করতে গেল। সে বদরপুর রেল কলোনি থেকে এসেছে জেনে, ওর পরিচিত কয়েকজনের নাম বলল, যে এঁদের সে চেনে কি না। এঁদের তো সে জ্ঞান হওয়া ইস্তক চেনে। বাবার খুব কাছের মানুষ ওঁরা। বাবা ওঁদের দাদা ডাকেন ; মিত্রদা, গোস্বামীদা বলেই ডাকতে শুনেছে। বাবা নিজেও তো অবসরে পার্টি অফিসে গিয়ে পত্রিকা পড়েন, গল্প করেন। গণশক্তি পত্রিকার নাম দিপু জানত। সবটা শুনে অরূপদা বলে, তুমি তো দেখছি আমাদেরই ছেলে। ‘আমাদের ছেলে’ ,- কথাটা গেঁথে রইল দিপুর মনে। এরমধ্যে যেন ভেসে রইল আত্মীয়তার সুর। একদিন দিপু আর সারথি গেল নাজিরপট্টিতে সিপিএম-এর পার্টি অফিসে। অরূপদাই আসতে বলেছিল ওদের। দিপু অবাক হয়ে দেখছে অফিসটা। চারপাশে অনেক ছবি। কয়েকজনের ছবি দেখলেই বোঝা যায়, এরা বিদেশের। একজনের মাথা ভরা চুল, এক মুখ দাড়ি। কে ইনি? একজন বয়স্ক ভদ্রলোক একটা চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করছেন, নিবিষ্ট মনে। সারথি বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখিয়ে, ফিসফিস করে দিপুর কানের কাছে মুখ এনে বলে, জানিস, উনি ক্ষিয়ে,দিপু ওকে দেখল এই প্রথম। চিনবে কি করে। সে মাথা নাড়ে। সারথি বলে, ইনিই গোপেন রায়। পরে বলব তোকে। সারথির চোখে মুখে উপচে পড়া মুগ্ধতা ; দিপু বুঝতে পারে, এই বয়স্ক ভদ্রলোকের জীবন, আর পাঁচ জনের মত নয়।
আরো কিছু ছেলে বসে আছে পার্টি অফিসে। ওদের কাউকেই দিপু চেনে না। মেঝেতে চাটাই পাতা। অরূপদা এলো একটু পরেই। এসেই এক গাল হেসে জিজ্ঞেস করল, কখন এসেছ?
(ক্রমশঃ)
।। ১৪ ।।
ঘাটের কথা -১
আমরা যেখানে ছিলাম, সেটা ঢাকা থেকে খুব একটা দূর নয় ; আবার নেহাত কাছেও নয়। আমাদের ছিলাম না-গাঁয়ের , না- শহরের লোক। বাইরের লোকে বলত, গ্রাম, বকুল গ্রাম। আমরা বলতাম, বকুল নগর। তার প্রমাণও আছে। একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। বকুল নগর প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়। আমি সেই স্কুলে পড়েছি। আকাশী রঙের সালোয়ার পরে যেতাম। মাথায় সাদা ওড়না ঢাকা থাকত। কেউ কেউ হিজাব পরে আসত। প্রাইমারী স্কুলে আমরা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়তাম। তারপর যেতে হত হাই স্কুলে। ঢাকা থেকে দ্রুতযান বাসে মাত্র চার ঘণ্টা লাগে আমাদের বকুল নগর পৌঁছতে। বাস যেখান থামে, সেখান থেকে রিক্সায় বকুল নগর আসতে হয়। রিক্সার চালককে বললেই হয়, বড় বড় শিমূল গাছের রাস্তা ধরে যাবা। তারপর ডানে ঘুরলে, দেখবা একটা বড় দীঘি। তাতে শাপলা ফুটে আছে। মেয়েরা ঘাটে বসে বাসন মাজে, কাপড় ধোয়, দীঘির পাড়ে নরম ঘাসের উপর মেয়েরা কাপড় শুকোয়। রিক্সা চালক গাছ, দীঘি চিনে চিনে এগোয়। আর সওয়ারি তাকে বলে যায়, এবার বাঁয়ে যান মিয়াঁ , ওই মরা কাঁঠাল গাছের পাশ দিয়া। সামনেই একটা মাঠ আর দুই খান খালি বাড়ী। কেউ থাকে না । ওরা ইন্ডিয়া চইলা গেছে । সবাই অপেক্ষায় আছে, কবে ওরা ফিইর্যা আইব। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, ওরা ফেরে না। দ্যাশের টানে, মাটির টানে, দীঘির টানে, শিমূল গাছের মায়াময় ছায়ার টানে, শাপলা ফুলের টানে, অঘ্রানের ধানের টানে, কোনো টানেই আর ফেরে না ওরা। যেন শূন্যে মিলায়া গেছে। রিক্সা চালক নীরবে শুনে যায়, আর প্যাডেল মারে। একসময় সওয়ারির গন্তব্য এসে পড়ে। ভাড়া মিটিয়ে সে নেমে পড়ে।
আমাদের বকুল নগর এরকমই। মানুষ গুলো আধপাগলা কিসিমের। শুনেছি বাবার মুখে, একাত্তরের ঝড়ের পরে, এরকম হয়ে গেছে। এরা অর্ধেক পৃথিবীর, আর বাকী অর্ধেক খোয়াব-দুনিয়ার মেহমান হয়ে ঘোরে।প্রায় সব বাড়ীতেই এরকম এক-দু’জন মানুষ আছে। আমাদের বকুল নগরের শেষ প্রান্তে, যেখানে একটি নদী, একটি ছোট টিলার পাশ ঘেঁষে বাঁক নিয়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে, আর নদীর দু’পারে ধু ধু বালুচর , শীতকালে জেগে ওঠে, সেদিকে একটি নাবাল জমি থেকে অজস্র নরকঙ্কাল , চাষিদের কোদালের কোপে কোপে ভূমি-গহ্বর ছেড়ে মানব সমাজে ঢুকে পড়ে। তারপর আলুথালু মানুষ দল বেঁধে দেখে এদের। আর্তনাদ করে কাঁদে। পরিচয়হীন কংকালগুলো মানুষের স্বপ্নে হানা দিতে থাকে। তারপর সবাই ঠিক করে, এদের নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। সেদিন নদীতীরে জড়ো হয় সবাই। এক এক করে ভাসিয়ে দেওয়া হল কংকাল। কেউ মনে মনে বলছে তোমাদের যেন জান্নাত নসীব হয়, কেউ প্রার্থনা করে তোমাদের অক্ষয় স্বর্গলাভ হোক। জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে তলিয়ে যায় সব নরকঙ্কাল। সেই রাতে অঝোরে বৃষ্টি হয়, বজ্রপাত হয়। বিশালাকার গাছগুলো যেন আছড়ে পড়তে চাইছে মাটিতে। কেঁপে কেঁপে উঠছে সমস্ত প্রকৃতি, এমন যেন ওরাও মানুষের ক্রন্দনে অংশভাক ।
এইসবই শুনেছি আমার বাবার মুখে। আমি তখন আসিইনি পৃথিবীতে। আমার জ্যাঠামশাই একাত্তরে হারিয়্বে যান চিরকালের মত। পড়াতেন ঢাকার এক কলেজে। জ্যাঠাইমা আজো অপেক্ষায় আছেন, একদিন ফিরে আসবেন জ্যাঠামশাই। এরকম হারিয়ে যাওয়া মানুষের ঠিকানা প্রায় সব বাড়ীতেই আছে। বাইরে থেকে কেউ বকুল নগর এলে মনে করবে, , এখানে সব মানুষই যেন অর্ধেক জাগ্রত, অর্ধেক ঘুমন্ত। আর চোখে ঘুম-ঘুম স্বপ্ন নিয়ে দিন গুজরান করে। বকুল নগরের জীবনে একটা তরঙ্গ আছে, সেটা মন্থর, ছায়াচ্ছন্ন, আতুর-বেদনাময় ধূসর। বকুল নগরের মানুষ তাই, বাইরে কোথাও গেলে, কোনো কাজে গেলে, স্বস্তি এতটুকু পায় না। তারা কাজ সেরে ফিরে আসে সত্বর।
রোজ আমাকে ঘাটে যেতে হয়। সাঁতার কাটি, চান করি। কাপড় কাচি। আমার বয়সী যারা আসে, তাদের সাথে গল্প করি। সকাল থেকেই মেয়েদের আনাগোনা চলে এই ঘাটে। কলসি কাঁখে জল নিয়ে নিয়ে যায়। ঘাটে বসে, জলের কাছে আমরা মন খুলে দেই। জলও শোনে সেই কথা। ফিসফিস করে বলা গোপন কথাও শোনে। জল শুধু শুনেই যায়, আর লুকিয়ে রাখে তার মনের কালো অতলে। এক বছর পর যখন ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হল আমাকে, আমার তখন মনের কথা বলার একটাই উপায় ছিল। বাঁধানো একটা খাতা। বকুল নগরে তখন আমরা , আমাদের মায়ের চোখে, সোমত্থ মেয়ে। আমার মা আমাকে বলতেন, সিয়ান মেয়ে। সিয়ান মেয়ের সবাধানে থাকতে হয়। কেন বলতেন, সেটা বুঝার বয়সও আমার হয়ে গেছে। ঘাটের সিঁড়িতে বসে জলে পা দিয়ে লাথি মারলে জল ছলাৎ ছলাৎ করে উঠত আর আমাদের ফ্রক ভিজিয়ে দিত। মুখেও পড়ত জলের ছিটে। আমরা সই পাতিয়েছিলাম, এসব মায়েদের কাছ থেকে শেখা। আমাদের তুলনায় বয়সে একটু বড় ছেলেরা আমাদের দিকে তাকাত। কে কার দিকে তাকায়, কে কাকে বইয়ের ভিতরে করে চিঠি দিল, সব গল্প হত আমাদের ওই ঘাটে বসে। কার কোন ছেলেকে ভালো লাগে, কিছুই আমরা গোপন রাখতাম না। মঞ্জরী, শিউলি, টগর,-- আমরা তিনজন ছিলাম সই। একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ি। এবার পাশ করে গেলে, অন্য স্কুলে যাব। ওখানে ছেলেদের বড় একটা স্কুল আছে। বকুল নগরের সবচেয়ে সুদর্শন ছেলে সামসুল সেই স্কুলে পড়ে। খুব ভালো ফুটবল খেলে, সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন। মা এখন আমাকে চোখে চোখে রাখেন। কেন রাখেন তার একটা বেদনাজনক কাহিনী আছে। আমার নিখোঁজ জ্যাঠামশাইর একমাত্র মেয়ে, পালিয়ে যায় শিমূলের সাথে। ওরা বিয়ে করে। কলমা পড়ে। শিমূলরা আমাদের তুলনায় বেশ অবস্থাপন্ন । বিয়ের পর শিমূলের বাবা এসেছিলেন আমাদের বাড়ীতে। বাবা যতটা ভদ্রভাবে সম্ভব , ভদ্রলোককে বিদেয় করে দেন। বলে দেন যে ওই মেয়ে আমাদের কাছে মৃত। চার বছর পর দিদির একটা ছেলে হয়। তখন সাহস করে ছেলেকে নিয়ে এসেছিল। রক্তের সম্পর্ক তো অস্বীকার করা যায় না। যতই সংস্কারে বাঁধা দিক, রক্ত তবু রক্তকে টানে। স্নেহের, মায়ার, বাৎসল্যের উষ্ণতায় গলে যায় সংস্কারের বরফ। কান্না হয়ে গলে পড়ল সেই বরফ। এর পড়ে শিমূলও এসেছিল। আমি দুলাভাই ডাকতাম। বাড়ীর কাউকে না জানিয়ে, লুকিয়ে স্কুল ফেরত ঢুকে যেতাম দিদির বাড়ী। ওড়নাটাকে হিজাবের মত করে মুখ ঢেকে ঢুকে পড়তাম। ক্লাস এইটের পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হই। সেই আনন্দে সেদিন ঢুকে পড়েছিলাম দিদির বাড়ী। কিন্তু কি করে যেন খবরটা বাবার কানে যায়। মাস খানেক আগে আমাদের বয়সী আরেকটি মেয়ে পালিয়ে জায়,রফিক বলে এক সাইকেল মেকারের সাথে ।
এক রাতে বাবা আমাকে ডাকলেন। বাড়ীর সবাই ছিল। ঘরের পরিবেশ দেখে আমি ভয়ে কাঠ। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাবা বললেন, ফুল, তোরে সুশীলের ওখানে পাঠাইয়া দিমু। ওখানেই পড়বি। আমি চিঠি দিছিলাম সুশীলরে। ল্যাখছে কুনো অসুবিধা নাই। লহমায় আমার মন অন্ধকার হয়ে গেল। সেই ঘোর অন্ধকারে ডুবে আছে বকুল নগর, দীঘি, আমার সই, বড় বড় গাছের ছায়া। আমাকে ইন্ডিয়া চলে যেতে হবে! সেই রাতে খুব কাঁদলাম আমি। মা বললেন, আমরা তো যামু বছরে এক দুই বার। ওখানে গেলে দেখবি, ভাল্লাগবে। কান্দিছ না মা।
বাবা , মা আমাকে নিয়ে এক দুপুরে রওনা দিলেন ইন্ডিয়া। সইরাও কাঁদল। দীঘির জল কাঁদল। ছায়াময় পথ কাঁদল। আকাশ কাঁদল। মেঘেরা দল বেঁধে দেখতে এল আমার চলে যাওয়া। এক সন্ধ্যে বেলা আমি মায়ের হাত ধরে নামলাম ট্রেন থেকে। বাবা রিক্সাচালককে বললেন, পাব্লিক স্কুল রোড চল। যেতে যেতে সব পথ গুলিয়ে গেল আমার। আর আমি মনে মনে তুলনা করছি, জায়গাটা আমাদের বাংলাদেশের কোন শহরের মত। এখানে তো সবাই বাংলাতেই কথা বলে। সেই রাতে ঘুমের মধ্যে দুলাভাইয়ের চাচাতো ভাই ফারুক দেখা দিল। বলল, ফুল , তুমি চলে গেলে ?
(ক্রমশ)
।। ১৫ ।।
শীতকাল
শীতটা এবার বেশ জাঁক করে আসর বসিয়েছে। কার্তিকের শেষেই, ভোরে,হালকা হিম-লাগা বাতাসে ভরে যেত ঘরটা। ঘুমের মধ্যেই টের পচ্ছি, শীতল হয়ে আসছে দেহ। ঘুমঘোরেই, চোখ না খুলে টেনে নেই, পাশে রাখা বেডকভার। তবু শীত-শীত ভাবটা , সর্বাঙ্গে, ভিজে কাপড়ের মত লেপ্টে থাকে। এর কারণটা হল, ফ্যানের হাওয়া। দাদার আবার ফ্যান না চালিয়ে ঘুম আসে না। অথচ সে কোনো চাদর-টাদর ছাড়াই দিব্যি ঘুমোচ্ছে। এসময় ফ্যান চালানো নিয়ে কোনো অনুযোগ করলে, সে ঠাট্টা করে বলে, তুই হচ্ছিস শীতলরক্তি প্রাণী। উল্টে আমাকে উপদেশ দেয়, বেশী করে কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন খেতে। দাদা নিজে কিন্তু পেঁয়াজ- রসুন না খেয়েই, শেষ-কার্তিকের ভোরবেলাকার হিমলাগা বাতাসে, ফ্যান চলিয়ে ঘুমোতে পারে । এতটুকু অসুবিধে হয় না তার। এরই মধ্যে কখনো হয়তো আমাকে ভোরে বেডকভার জড়িয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকতে দেখে, দাদার হয়তো মায়া হয় আমার জন্য। একদিন রাতে ফ্যান না চালিয়েই ঘুমোতে যায়। আমি জিজ্ঞেস করি, ফ্যান চালাবি না? সে বলে, না, এখন বেশ ঠাণ্ডা লাগে। আমি সব বুঝেও , না বোঝার ভান করি। মনে মনে বলি, বাঁচা গেল। দাদা কি আমার মনের কথা বুঝতে পারে ? সম্ভবত না। ভাগ্যিস আমরা অন্যের মনের কথা বুঝতে পারি না। না হলে মানুষের কোনো রকম গোপনতা থাকত না। মানুষ তো শুধু ইট-কাঠ, ঘর-বাড়ী, সমাজ-সংসার নিয়ে বাঁচে না, তার চেয়ে অনেক বেশী বাঁচে, মনের গহীনে। কত কি ভাবে, কত রকম ছবি আঁকে , স্বপ্নের, কামনা-বাসনার, বেদনারও ; কই, সেসব তো শুনতে পাই না , দেখতে পাই না আমরা। পাই না বলেই মানুষের মনের মত রহস্যময় আমাজনের জংগলও নয়। যদি কোনো বিজ্ঞানী এমন কোনো যন্তর বানিয়ে ফেলতেন, যা দিয়ে মানুষের মন পড়ে ফেলা যায়, মনের সদর দরজা, জানালা হাট করে খুলে ফেলে, বে-আব্রু করে ছবি তুলে ফেলা যেত, তাহলে কি হত ?
শীত এলে আমার মায়ের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ফুল গাছ তো আছেই, তার সাথে জুড়ে বসে রকমারি শব্জি লাগানো, তাদের পরিচর্যা করা। পাশের পাড়ার গোয়ালা বাড়ী থেকে গোবর বয়ে আনা, তাও মাথায় ঘোমটা টেনে। মাকে মাথায় ঘোমটা না টেনে পাড়ায় কখনো বেরোতে দেখিনি। আসলে বাবা এই পাড়ায় কনিষ্ঠদের দলে পড়েন। তাই মায়ের এটাই সহজাত সংস্কার, যে বড়দের সামনে মাথায় ঘোমটা না থাকাটা অসমীচীন। মাটি খুঁড়ে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শিম গাছ, লাউ গাছ, মুলো গাছ প্রতি শীতে লাগাবেনই। বাবা অবশ্য বাঁশ কামলা ডেকে লাউ আর শিমের জন্য মাচা বানিয়ে দিতেন। বীজ ফুঁড়ে যখন শিম আর লাউয়ের চারা বেরোত, এক্কেবারে ছোটবেলায়, আমার বিস্ময়ের সীমা থাকত না। আমি বসে বসে দেখতাম, চারার মাথায় , মুকুটের মত ঝুলে আছে বীজটা। একদিন সকালে দেখতাম, টুপ করে খসে পড়েছে সেই বীজ, আর চারাটা, রোদে, দু’দিকে বাহুর মত করে , মেলে দিয়েছে তাঁর দুটি পাতা। চারাগুলো বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে মায়ের আনন্দ। আমরাও সেই আনন্দে শরিক হতাম। এখনো তাই হয়। তবে আমরা বড় হয়ে গেছি বলেই হয়তো, মায়ের সরল আনন্দের ভাগ দূর থেকে উপভোগ করি। আগের মত, তেমন আপ্লুত হই না। তবে বাবার যেন এসবে কিছুই এসে যায় না। মা বাবাকে দেখার জন্য ডাকেনও না। কিন্তু, মায়ের এই ফুল গাছ লাগানো, শীতে শব্জি বাগান করার পেছনে যে নীরব প্রশ্রয় রয়েছে, সেটা এখন বুঝি। আগে মনে হত, বাবা যেন কি রকম মানুষ! একটু দেখে গেলে কীই বা হয়। গম্ভীর বাবাকে সেকথা বলার সাহস আজো জুগিয়ে উঠতে পারিনি , আমরা দু’ভাইয়ের কেউ। বাবা বাড়ীতে থাকেনই বা কতক্ষণ। স্কুল করে, ছাত্র পড়িয়ে, কোন ছাত্রের কি অসুবিধে হচ্ছে খবর নিতে বাড়ী যেতে, বিশেষ করে কারো অসুখ করেছে শুনলে, বাবা খুঁজে খুঁজে , পায়ে হেঁটে তার বাড়ী গিয়ে হাজির হবেনই। তারপর আছে বাবার আড্ডা। যে দোকানে ওঁরা আড্ডা দিতেন, সেখানে বাবাদের বড়দেরও আড্ডা ছিল। ফলে ওঁদের আড্ডা বসত, সাড়ে সাতটা- আটটায়। সেই আড্ডা গড়িয়ে সাড়ে ন’টার দিকে গড়াতেই বাবা বাড়ী ফিরতেন। দশটার মধ্যে খেয়েই, রেডিওর বাংলা খবর শুনে ঘুমোতে যেতেন।
এবার সংক্রান্তির দু’চার দিন আগে ঝপ করে শীত কমে গেল। সরস্বতী পুজোর সময় যেরকম উষ্ণতা থাকে, ঠিক সেরকম। সোয়েটার পরে, দিনের বেলা রাস্তায় বেরোলে, গরম লাগে। সংক্রান্তির একদিন আগে আকাশ পুরো মুখ ভার করা মেঘে ঢেকে রইল। প্রতি বছরই বাবা এক বোঝা খড় আনান। সংক্রান্তির দিন, ভোরে উঠে গরম জলে চান করে, খড়ের গাদায় আগুন লাগানো হয়। আগুনের উত্তাপে আমরা হাত সেঁকতাম। শরীর থেকে শীতও পালিয়ে যেত। এবার বারান্দায় মিঠে রোদে বসে পিঠে খাবার পালা। আমাদের সবার জন্য একটা করে জলচৌকি আছে। এখনো সেই রেওয়াজ চলে আসছে। তবে এবার, ভোরে উঠে দেখা গেল, দু’হাত দূরে কিছু দেখাই যাচ্ছে না। এত ঘন-গভীর কুয়াশায় ঢেকে আছে চারদিক। ঝটপট চান সেরে খড়ের গাদায় আগুন দিয়ে, আগুন পোহানো হল। শীত তবু গেল না। মা পিঠে সাজানো প্লেট দিয়ে দিয়ে গেলেন। একটু পরেই বেরোতে হবে। দাদা, আমি, বাবা,-- সবাই বেরিয়ে যাব। মা শুধু একা থাকবেন ঘরে। হয়তো পাশের বাড়ীর মাসীর সাথে মাঝে খানিকটা সময় গল্প করে আসবেন। আমারা যখন বাড়ী থাকি না, তখন মা’র একা লাগে কিনা, সেটা তো জানতে চাইনি কখনো। যেন এই ঘর পাহারা দেওয়া, সবার জন্য রান্না করা, কাপড় কাচা, ঘরদোর সাফসুতরো রাখাটাই মা’র কাজ। আর এই সব মিলিয়েই মা’র সংসার। এর মধ্যেই মা’র জীবনের পরিপূর্ণতা। এনিয়ে মা’র মনে কোনো ক্ষোভ নেই।
আমি সোজা হাঁটা দিলাম মিঠুনের বাড়ীর উদ্দেশে। মিঠুনের বাবা ইমারজেন্সির সময় জেল খেটেছেন। নকশাল পার্টি করার জন্য। ছোটবেলা থেকেই বাবার বইয়ের সংগ্রহ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনী পড়ে, মিঠুনের বাবার মত মানুষদের প্রতি একটা আকর্ষণ বোধ করতাম। পার্টি-টার্টি বুঝি না, কিন্তু একটা মানুষ নিজের আদর্শের জন্য জেলে গেছে, এটা আমাকে রোমাঞ্চিত করত। যাঁদের কথা বইয়ে পড়েছি, তাদের মতই একজন মানুষকে সামনা-সামনি দেখব, এটাই ছিল মিঠুনের সাথে আমার বন্ধুত্বের গূঢ় রহস্য। ওকে আমি প্রথম দেখি কলেজে। মিঠুনের মুখেই শুনেছি, নকশালরা সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাস করে। আমার মনে পড়ে যায়, মাস্টারদার কথা। আমি শিহরিত হই। ঘোর লেগে যায়। মিঠুনের বাবা দীর্ঘকায় মানুষ। মুগুর ভাঁজা পেটানো শরীর। ধুতি পাঞ্জাবী পরেন। কালো রঙ। চুল আঁচড়ান ব্যাকব্রাশ করে। মাথা ভর্তি ঘন চুল। মিঠুনের ঘরের দরজা ঠেলে ঢোকার সময়, বুকের ভিতরে একটা পুকুর ছিল, তার জলে ঢেউ খেলে গেল। আজ আমি সত্যিই কি মিঠুনের বাবার সাথে গল্প করতে এসেছি ? মন তবে এত উচাটন করছে কেন ? গল্পে মন বসছে না। থেকে থেকে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছি। আমি শুধু মিঠুনের বাবার ঠোঁট নড়াই দেখে যাচ্ছি। তিনি কি বুঝতে পারছেন ? এতে তো তাঁকে অসম্মান করছি আমি। এই গ্লানিবোধ থেকে নিষ্কৃতি জুটল আমার। ফুল এক প্লেট ভর্তি পিঠে নিয়ে এল আমার জন্য। লহমায় হারানো সম্বিত ফিরে পেলাম আমি। আবার সেই পুকুরে ঢেউ উঠল। ফুল কি একটু সময়ের জন্য আমাদের সাথে বসতে পারে না ? ও এখনো বাংলাদেশী কায়দায় মাথার উপর দিয়ে ওড়নাটা গলায় পেঁচিয়ে রাখে। এখনো কথায় কথায় ইন্ডিয়া বলে। মনে মনে বললাম, ফুল, একটু বসে যাও।
( ক্রমশ )
।।১৬।।
কবি-পাঠক সংবাদ
জল গড়িয়ে গেছে এরমধ্যে বহুদূর ; বরাক নদীটির বুকে এখন বালু চিকচিক করে। দিপু কলেজ যাবার সময় দেখে ; জাহাজ গুদামের পাশ দিয়ে দেখা যায়। সারথি আর সে এখন একসাথেই কলেজ যায়। এখন তো ওরা কমরেড। পঁচিশ পয়সার কুপন বেচে, গোটা ক্লাসকেই কমরেড বানিয়ে দিয়েছে দিপু আর সারথি। সারথির নতুনপট্টীর বাড়িটি দিপুর ভীষণ ভালো লাগে। পুরনো ধাঁচের কাঠের দোতলা বাড়ী। পিছনে বড় উঠোন। তার চার পাশ ঘিরে আসাম টাইপের একতলা ঘর। রান্না ঘর, ঠাকুর ঘর, স্টোর রুম। আর কিছু ঘর পুরনো ভাঙা আসবাবে বোঝাই করা। সেসসব ঘরের দরজা কাউ খোলে না। একটা ঘর আবার কাঁসা-পিতলের বাসনে ভর্তি। সেসবের আকারও বেশ বড়। একটা ডেগে অন্তত পঞ্চাশ জনের ভাত রান্না করা যাবে। সারথি বলেছিল, এগুলোর এন্টিক ভ্যালু আছে। এন্টিক শব্দটা এই প্রথম কারো মুখে শুনল, যার সংগ্রহে এন্টিক জিনিষ আছে। এত বিশাল বাড়ীতে লোক বলতে মাত্র পাঁচ জন। একটা ঘরে থাকে ওদের সর্বক্ষণের কাজের দিদি। বিধবা, নিঃসন্তান মহিলা। বাড়ীর আয়তন আর বাসনপত্র দেখে বোঝা যায়, এই বাড়ীতে একদিন লোকে গমগম করত। সারথির পূর্ব পুরুষদের জমিদারী ছিল সিলেটে। তখনই পূর্ব পুরুষের কেউ বাড়িটি বানিয়েছিলেন। শিলং-এও ওদের একটা বাড়ী আছে। সেটা এখন খাসিদের দখলে। সারথি বলেছিল, ভাগ্যিস কেউ বুদ্ধি করে দেশভাগের আগে বাড়ীটা বানিয়েছিলেন, তাই এদেশ মাথা গোঁজার মত ঠাই মিলেছে। এখন অবশ্য ওর জ্ঞাতিরা সবাই বিদেশ। শুধু ওর বাবাই রয়ে গেলেন । একটা কোওপারেটিভে চাকরী করতেন। সেখানে তেমন কিছু কাজ ছিল না। রুগ্ন, দীর্ঘকায় পুরুষ। হাঁফানিতে ভুগতেন। তবু তিনি ধূমপান করতেন। তবে সেটা গড়গড়ায় , যার নিচের অংশটা পিতলের। এর নলটা বেশ লম্বা। তামাকের সুগন্ধে ঘর ভেসে যেত। সারথি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, কি রে খাবি নাকি ?
- তুই খেয়েছিস ?
- দুপুরে মা ঘুমিয়ে থাকলে আমি মাঝে মাঝে টান দিই।
সেই সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল একদিন। সারথির মা বেড়াতে গেছেন। কলেজে কি একটা ছুটি। ঘরের দরজা বন্ধ করে, অনেক কসরত করে সারথি হুঁকো ধরাল। নল দিয়ে টানলে , একটা গুড়গুড় শব্দ করে। কিন্তু গন্ধটা অসম্ভব মন মাতানো এবং মিষ্টি। প্রথম টানেই দিপু কাশতে শুরু করে। সারথি বলে, ধীরে বন্ধু, ধীরে। সারথি দেখিয়ে দেয় কি করে টানতে হয়। তবে কলকে সাজানোটা ভীষণ ঝকমারি। সেদিন হুঁকো টানার পর, দিপুর মনে হচ্ছিল, তার আত্মা অবধি সুগন্ধে ভরে গেছে।
সেদিন কলেজে ক্লাস হল না পরপর তিন পিরিয়ড। ক্লাস না থাকলে এখন বেশ মজাই হয়। অনেক বন্ধু হয়েছে ক্লাসে। আর ততদিনে ওরা লুকুদার স্টলে ঢোকার হকদার হয়ে গেছে। তিন কাপ চা, পাঁচ কাপ করে খাওয়া যায়। অন্যদের বলতে শুনেছে, লুকুদা, তিনটায় পাঁচটা দাও। লুকুদাও দিয়ে দেয়। দেখতে দেখতে একটা সময়, লুকুদা বাকীতেও চা দিত। ক্লাস না থাকলে , লুকুদার স্টল গুলজার করে তোলা ছাড়া আর কাজ নেই। সেদিন সব শেষ পিরিয়ড ছিল বাংলা। বাংলার ক্লাসটা অনেকেই ফাঁকি দেয়। সারথি খাতা খুলে রুটিন দেখে নেয়, কার ক্লাস। কোনো স্যারের নাম লেখা নেই। বাংলা ছাড়া আর মাত্র দুটো ক্লাস; কেমিস্ট্রি আর ফিজিক্স। এ দুটো ক্লাস ছাড়া যাবে না। শেষ ক্লাসে থাকবে কি না, দোনামনা করতে করতে, বাংলা ক্লাসের স্যার এসে গেলেন। শ্যামবর্ণ, শার্ট প্যান্ট পরা, জে আর সি-র মত ধুতি পাঞ্জাবী পরা নয়। মাথা ভরা ঘন চুল। ক্লাসে ঢুকে সোজা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। রোল কল করলেন। এবার একটা বই খুলে পড়া শুরু করলেন। ফুল্ল্ররার বারমাস্যা। স্যারের কণ্ঠস্বর খুব সুন্দর। পড়াচ্ছেন , না নিজেই নিজের জন্য পড়ছেন, বোঝা যাচ্ছে না। একেবারে পেছনের সারিতে একটু মৃদু গুঞ্জন যেন শুরু হল। স্যারের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। আপন খেয়ালে পড়ে যাচ্ছেন। এবার পড়া শেষ হতেই, জিজ্ঞেস করলেন, কেমন লাগল কবিতাটা ? ক্লাসের সবচেয়ে ফিচেল কমলেশ, সটান দাঁড়িয়ে উঠে বলল, খুব ভালো লেগেছে স্যার। কিন্তু বুঝতে পারিনি। বলেই সে বসে পড়ে। স্যার মুচকি হেসে বোঝাতে শুরু করেন। বোঝানো বলতে, প্রতিটি পংক্তি পড়ছেন, আর বাংলা গদ্যে অর্থ বলে যাচ্ছেন। ‘ মাংস নাহি খায় লোকে করে নিরামিষ’,-- কেন নিরামিষ খায় এটা জানার ইচ্ছে ছিল বুদ্ধর। জিজ্ঞেস করবে কি ? বুদ্ধ আর মিঠুন মাঝের দিকের বেঞ্চে বসেছে। ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস আর করাই হল না। ততক্ষণে ক্লাস শেষের ঘণ্টা বেজে গেছে। স্যার নাম ডাকার খাতা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কে ইনি ? নিজের নামও বলেন নি। কেউ জিজ্ঞেসও করেনি। স্যারের একটা অভ্যেস বুদ্ধর চোখে পড়ল। মাথা ঝাকিয়ে, কপালের উপর নেমে আসা চুলগুলোকে বিন্যস্ত করা। এরকম কাউকে করতে সে দেখেনি। বুদ্ধর কৌতূহল হচ্ছে স্যারের নামটা জানার। উৎসাহী কেউ এর মধ্যে নাম জেনে এসেছে। লুকুদাকে জিজ্ঞেস করতেই বলে দিল। শক্তিপদ ব্রহ্মচারী। দিপুও শুনেছে। সে তো রোমাঞ্চিত। ছাপার অক্ষরে যার কবিতা দেখে কলকাতার দেশ, অমৃততে, তিনি আজ তাদের পড়ালেন। বুদ্ধ কবিতা পড়তে ভালোবাসে বটে। তবে রবীন্দ্রনাথের। দিপু মাঝে মাঝে গল্প লেখার চেষ্টা করে। কিন্তু কবিতা পড়ে প্রচুর। আর সারথির পাল্লায় পড়ে, জীবনানন্দের কবিতাও পড়েছে। যদিও পড়তে ভালো লাগে, কিন্তু কেন যেন বুঝে উঠতে পারে না। দিপু আর সারথি টিলা বেয়ে উঠতে লাগল। বুদ্ধ মিঠুনের সাথে গল্প করতে করতে, যেদিকে দিপু আর সারথি যাচ্ছে, ঠিক তার উল্টো পথে সুভাষ নগরের দিকে যে রাস্তাটি নেমে গেছে, সেই পথে হেঁটে যাচ্ছে। মিঠুন বলল, আমাদের বাড়ীতে শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতার বই আছে। বুদ্ধ বলে , আমাকে দিবি? মিঠুন রাজি হয়ে যায়। সেদিন সারারাত বুদ্ধ ডুবে রইল ‘সময় শরীর হৃদয়’-এর ছত্রে ছত্রে।
( ক্রমশ)
Comments
Post a Comment