যেমন কাটছে দিন
নদীর কথা
সৌমিত্র বৈশ্য
বিশ্বাস করুন, বা নাই করুন, আমরা কিন্তু জীবনের একটা সময়ে, সত্যিই খুব ছোট ছিলাম। সেই ছোট-পর্বের একটা পর্যায়ে, আমাদের এতটাই ছোট থাকতে হয়েছিল, যে আমাদের হাতে কিছুই ছিল না, বা থাকত না। লাল বল, চুষি কাঠি হাতে পেলেও,ধরে রাখার প্রবৃত্তি ছিল না। ছুঁড়ে ফেলাই ছিল আমাদের পরম ধর্ম। এমনকি বড় হয়ে যে-আমরা, যৌবনের জলতরঙ্গে (রঙিন নয় মোটেই; সেটা বঙ্কিম মার্কা, কালী মার্কা নয় কিছুতেই) ভেসে আবৃত্তি করতাম, ‘মনে কর জুতো হাঁটছে , পা রয়েছে স্থির’,-- সেই পায়ের উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না ( আর সেই হেতু আমাদের কোনো পথের দাবীও ছিল না। পথ চলতে হলে অন্য কারো ক্রোড়ে স্থাপিত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না )। বিজ্ঞানীরা বলেন, ওই সময় থেকেই নাকি শিশুদের মাথায়, (কথাটা বোকার মত হয়ে গেল, পায়ের তো আর স্মৃতি হয় না),অবশ্যই যারা biologically জৈবিক প্রক্রিয়ায় জাত, স্মৃতি ইট্টু ইট্টু করে ছাপ ফেলতো শুরু করে। আমিও সেই সব পর্বের মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত হতে হয়েছিল। আমার দাদুর বাড়ির, অদূরে না বলে অতি নিকটে বলাই শ্রেয়, একটি নদী ছিল, এখনো যা আছে, নদীর তো আর হাত পা নেই, যে এদিক ওদিক চলে যাবে ; তো, সেই নদীর নামেই এখন আমাদের ভৌগোলিক পরিচয় হয়ে গেছে। নদীর নামটি বরাক। আমরা বরাকবাসী । যা বলছিলাম, দাদুর কোলে চেপে, নদীর তীরে যেতাম। কেন যেতাম ? জাহাজের ভেঁপু শুনতে। কী হচ্ছে , কিছুই বুঝতাম না। তবু ভেঁপু শুনতে যে কী ভালো লাগত। তারপর , ধরুন পা গজাল, তখনো দাদুর হাত ধরে, যেতাম সেই নদীর তীরে। কী সব বিশাল আকারের জাহাজ ! কত লোকে মিলে জাহাজ থেকে মাল ওঠাচ্ছে, নামাচ্ছে। বাংলায় ওই নদীর পাশের রাস্তাকে বলত, জাহাজ গোদাম। ইংরেজী নাম স্টিমার ঘাট রোড। গমগম করত জায়গাটা। তখন কিন্ত এই বরাক নদীতে বন্যা হত না। বহুকাল আগে একবার হয়েছিল। সেটা আজও রূপকথা হয়ে আছে। কিন্ত আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন কিছুতেই বন্যা হত না। আমরা যখন ইস্কুলে ঢুকে গেছি, তখন পরীক্ষার খাতায় লেখতাম, ‘বন্যা আশীর্বাদ , না অভিশাপ’। তখন কী জানতাম, যে এই অভিশাপ অংশটি আমাদের জীবনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে জুড়ে যাবে ! ইস্কুলের বইয়ে আমরা চীনের দুটো নদীর নাম মুখস্থ করতাম। ওদের বলা হত দুঃখের নদী। আমাদের কোনো দুঃখের নদী ছিল না। এখনো নেই। যদিও বর্ষার মরসুমে গোটা দেশের কোথাও না কোথাও , প্রতি বছরই বন্যা হয়। এই তো, খবরে পড়লাম, খোদ দিল্লি নাকি জমা জলে ডুবে গেছে। অযোধ্যা ডুবে গেছে। ডোবা ভাসা তো জীবনের অঙ্গ । ব্যাপারটা দর্শনিক ভাবে নিলেই হয়। এই দেশ ধর্মের। এই দেশ দর্শনের। আমরা ইহকালে কৃচ্ছ সাধন করে, পরকালের পরমান্ন খাবার দর্শনে বিশ্বাস করি। নিয়তি, নিয়তি,-- সকলই নিয়তির খেলা। ললাট লিখন বলে একটা কথা আছে। এসব আমরা খুব মানি। দুর্গত মানুষ তো আরো বেশি করে মানে। না মানলে তো চলবে না। এই দেশ ধর্মের দেশ। তাই, ধর্ম যে দর্শন শেখায়, আমরাও তাই শিখি।
শুরুতে যে জাহাজ ঘাটের কথা বলেছিলাম, সেই জাহাজ ঘাট বলুন, আর স্টিমার ঘাটই বলুন, এখন আর এখানে জাহাজ আসে না। সে বহুকাল হয়ে গেল। তবে এপার ওপার করতে, কিছু জায়গায় স্টিমার চলে। যাত্রী নিয়ে আসে, যায়। সেটাও একদিন হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন একটা ব্রিজ হয়েছে। আমাদের ব্রিজ গুলো বেশ শক্ত পোক্ত। দেশের অনেক জায়গায়ই ব্রিজ ভেঙে যাচ্ছে। বিমান বন্দরে ছাদ ভেঙে যাচ্ছে। এসব আমাদের গা সওয়া ব্যাপার। আরে মশাই, মানুষের জীবনই তো পদ্মপাতায় জল। সেখানে, ব্রিজ , ছাদ ,-- এসব তো অতি তুচ্ছ ব্যাপার। তাই আমরাও এসৱ নিয়ে মাথা ঘামাই না। তবু, নদী নিয়ে যে আমাদের সমস্যা আছে, সেটা বুঝেছিলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। নমামী গঙ্গে নামে একটা প্রকল্প শুরু হয়। এদিকে আমাদের রাজ্যেও নমামী ব্রহ্মপুত্র। নমামী ব্রহ্মপুত্র হলে, আমরা কেন বাদ পড়ব ? হল নমামী বরাক। বিশাল অনুষ্ঠান। বাঙালি হিসেবে বঞ্চিত হবার ক্ষোভ আমাদের আর রইল না। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, বরাক নদীতে একটা ড্রেজার এসেছিল। সেটা দিয়ে নদীবক্ষে খনন করে, বরাক নদীর নাব্যতা বাড়ানো হবে। জলপথে জাহাজ আসবে। কম খরচে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আসবে। সাধারণত , ট্রাকে করে সব কিছু আসে। সড়ক পথ বন্ধ হয়ে গেলে, বাজার আগুন হয়ে ওঠে। আমরা পুলকিত হলাম। বরাক আবার জাহাজ চলাচলের উপায়ুক্ত হবে। ফলে , আর বন্যাও হবে না। এটাই আমাদের পরম প্রাপ্তি। কিন্তু, দিন যায়, মাস যায়, সেই ড্রেজার আর আসে না। বরাক নদীর গভীরতা এতই কমে গেছে, যে কোনো কোনো জায়গায়, শীত কালে পায়ে হেঁটে, নদীর মাঝ বরাবর চলে যাওয়া যায়। মানুষ অকাতরে গাছ কাটছে, টিলা কাটছে, পাহাড় কাটছে। মাটি ধ্বসে যাচ্ছে। সেই মাটি এসে পড়ছে বরাকে। ছিল তার বুকে আর বেশি জল নিতে পারে না। উগড়ে দেয় অতিরিক্ত জল, তার দুপাশের লোকালয়ে। ফলে, নদী ঢুকে পড়ে, মানুষের উঠোনে, ঘরে। এই বছর, এই দু‘হাজার চব্বিশে, জুন মাসে আবার প্লাবিত হলো বরাকের দুই তীর। এটা তৃতীয় বারের প্লাবন। যথারীতি ইস্কুলে শরণার্থীর ঢল নামল। আজ গিয়েছিলাম , নদী দেখতে। আমি যেন দৈব বাণীর মত শুনলাম, নদী হেসে বলছে, আগলি মাহিনা ফিরসে বাড় ( বাংলায় বন্যা)। আগলি মাহিনা তিসরী বাড়।
নির্বাচন তো সবে শেষ হহল। নদিও বোধ করি, রাজনীতি বোঝে। না হলে, এক বছরেই 3.0 করে ফেলে, একক নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় !
Comments
Post a Comment