দোলযাত্রার চালচিত্র

 দোল চিত্র 

সৌমিত্র বৈশ্য 


বাল্যকাল হইতে শুনিয়া আসিতেছি, দোল ও দুর্গোৎসব, বাঙ্গালীর প্রধান উৎসব। বর্তমান কালে, এই বাক্যটিকে পলিটেকিলি বিশুদ্ধ করিতে হইলে, বলিতে হয়, হিন্দু বাঙালীর প্রধান উৎসব। বাঙ্গালীর সত্তায় দ্বিজাতী তত্ত্ব বর্তমানে অতিপ্রকট হইয়া উঠিয়াছে। ইহার যথোচিত লক্ষণও পরিলক্ষিত হইতেছে। উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় দেবগণ স্বমহিমায় বরাকভূমে আবির্ভূত হইতেছেন। গণেশ পূজা মহাধূমধাম সহকারে উদযাপিত হইতেছে। অনতি অতীতে গনেশ ঠাকুর, পয়লা বৈশাখেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পূজিত হইতেন এবং তিনি আকার-আয়তনে ব্যবসায়ীর দোকানের কুলিঙ্গিতে স্থান পাইবার মত আয়তন ধারন করিতেন। কিন্তু বর্তমানে যে গণপতি পাপ্পা প্যান্ডেল আলোকিত করেন, তিনি আকার-আয়তনে বিশালাকার। শিবাজী মহারাজও কদাচিৎ দর্শন দিলেও, বরাকভূমে স্বগৌরবে অভিষিক্ত হন নাই। দশেরাতে দশাননের নিধন যজ্ঞ অদ্যাপি আয়োজিত হয় নাই। তবে, একটি কুড়ি পঁচিশ ফুট দীর্ঘ দশানন পুত্তলি অগ্নিগ্রাসে ভস্মীভূত হইতেছে, এমন মেগাদৃশ্য একবার দেখিলে, বাঙালী নিশ্চিতই ঝাঁপাইয়া পড়িবে। কারণ, ইহা যুগলক্ষণ। ইহা ইভেন্টের যুগ, মেগা ইভেন্টের যুগ, রোড শো-র যুগ। দুর্গোৎসব গিয়াছে, দোল দুয়ারে কড়া নাড়িয়া গাহিতেছে, 'খোল দ্বার খোল'।

         দ্বার খুলিবার পূর্বেই, প্রাতঃকালে অসম্পূর্ণ নিদ্রাটি ভাঙ্গিল অমিতাভ বচ্চনের কন্ঠস্বরে। তাঁহার কন্ঠস্বরের গমকে যে আসমুদ্র হিমাচল মোহিত, সেই কন্ঠস্বর আমার বিরক্তির কারণ হইয়া উঠিল। অসময়ে নিদ্রা ভঙ্গ হইলে, সকলেই শৈশব হইতে বিরক্ত হয়। অবোধ শিশুগণ চিলচিৎকার করিবার অবাধ অধিকার লইয়া জন্মগ্রহণ করব। বিরক্ত হইলে প্রতিবাদ করিবার, এই জন্মগত  সহজাত চরিত্রটি অবশ্য বয়ঃপ্রাপ্তির সহিত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লোপ পাইতে থাকে ; ঠিক যে প্রকারে আমাদের পূর্ব পুরুষগণের ল্যাজটি একদা লুপ্ত হইয়া, আমাদিগকে আধুনিক মানবের আকার প্রদান করিয়াছিল। 

      পাঠক, নিদ্রাভঙ্গের প্রসঙ্গে ফিরিয়া আসি। অমিতাভ বচ্চন গীতবাদ্য সহকারে হোলি খেলিতেছেন। আওয়াজ শুনিয়া অনুমান করিতে পারি, বিশালাকৃতির অত্যাধুনিক শব্দযন্ত্র হইতে সেই গীত নিঃসরিত হইতেছে। তিনি তখন রঘুবীরের সহিত অবোধে হোলি খেলা সমাপ্ত করিয়া, নব্য উদ্যমে রঙ্গ বর্ষণ শুরু করিয়াছেন। সখিগণের চুনরি ভিজিয়া যাইতেছে। সিনেমার পর্দায় দেখা তাঁহার নৃত্যরত দৃশ্যটি মানসপটে ভাসিয়া উঠিল। তিনি নিরন্তর গাহিয়া যাইতেছেন। দন্ত মার্জনপূর্বক মুখ প্রক্ষালন করিয়া চা সহযোগে, সংগীতেই মনোনিবেশ করিলাম। 'বার্তালিপি' অদ্য প্রকাশিত হয় নাই। এক্ষণে অমিতাভ বচ্চন সংগীতে ক্ষান্তি দিয়াছেন; এইবার ট্যাংরা কানাই আসিলেন। বুঝিলাম, পাড়ার তরুণবৃন্দ দোল উদযাপনের জম্পেশ আয়োজন করিয়াছে। শব্দযন্ত্রটি স্তব্ধ হইবে না। একটি দিন না হয়, তাহাদের আনন্দ তরঙ্গে ভাসমান হইয়া কাটাইয়া দিব। বারো ঘটিকা নাগাদ যখন গৃহ হইতে নির্গত হইলাম, দেখিলাম তরুণেরা সফেদ দুগ্ধ সদৃশ পানীয় গ্লাসে করিয়া সেবন করিতেছে। ইহা যে দুগ্ধ নহে, তেমন ভ্রম হইবার মত সরল চরিত্রের অধিকারী নই। ইহার চরিত্র বুঝিলাম এবং কৌতুক অনুভব করিলাম। এই তরলটির রসাস্বাদন কদাপি করি নাই,  ইহার আবোল তাবোল চরিত্রের জন্য। 

      পথে যত অগ্রসর হইতেছি, চারিপার্শ্বের দৃশ্য বদলাইতেছে। বাইক বাহিনী অপ্রতিরোধ্য গতিতে আসিতেছে, যাইতেছে। যেন দৈবশক্তিতে , অশ্বশক্তিতে নয়, দ্বিচক্রযানটি চলিতেছে। যুবা ও যুবতীরা , কেহ কেহ , কেশমাধুর্য রক্ষার্থে পরচুলা পরিধান করিয়াছেন। কোথাও তরুণেরা প্রকাশ্যেই নানা প্রকার রঙিন পানীয় গলাধঃকরণ করিতেছে ও নিঃশেষিত বোতলটি সন্তর্পনে পার্শ্ববর্তী নর্দমায় প্রক্ষেপ করিতেছে। কোথাও বা তরুণেরা নানা প্রকার রঙ্গীন তরল পানীয়ের বোতল হইতে, পানীয় ঢালিতেছে। কেহ ঢুলিতেছে। কেহ পথিপার্শ্বে বমন করিতেছে। একটি মধ্য বয়স্ক দরিদ্র টলটলায়মান ব্যক্তি, পথে হুমড়ি খাইয়া পতিত হইল। তাহার হস্তধৃত পলিথিন প্যাকেটে সঞ্চিত, সামান্য পরিমান আবির পথে ছড়াইয়া পড়িল। সে পথ হইতে সেই আবির মুষ্ঠি ভরিয়া তুলিতে লাগিল। কিন্তু তাহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাহার নিয়ন্ত্রনে নাই। সে পথে আবিরের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া রোদন করিতে লাগিল। দৃশ্যটি অতি হৃদয়বিদারক। হয়তো তাহার কোনো ইয়ার দোস্তকে রাঙাইবার উদ্দেশ্যে সামান্য আবির ক্রয় করিয়াছিল। চারিপার্শ্বস্থ রঙ্গিলা পরিবেশে, এমত দৃশ্যে চিত্ত বিষণ্ণ হইবার অবকাশ পাইল না। আমি অগ্রসর হইলাম। কোথাও ঘেরাটোপ দিয়া নৃত্য গীত চলিতেছে। কেহ বা টুকটুক ভাড়া করিয়া দলবদ্ধ হইয়া হৈ হৈ করিয়া যাইতেছে। একটি মিষ্টির দোকানের সম্মুখে, একটি চাকাবাহিত দোকানের সম্মুখে কতিপয় যুবক জটলা করিতেছিল। একটি যুবক আমাকে দেখিয়া একটি শ্বেতবর্ণ তরলে পরিপূর্ণ গ্লাস আমার দিকে আগাইয়া দিয়া কহিল,- আঙ্কেল, ভাং ? আমি সহাস্যে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করিয়া অগ্রসর হইলাম। ফিরিবার সময় দেখিলাম, একটি গলিতে দেহাতি রমণী সংগীতের তালে কোমর দুলাইতেছে। রমণীটি গয়লানি। ইহাই অদ্যকার শ্রেষ্ঠ রমণীয় দৃশ্য। 

     শেষ পাতে যে কথাটি না বলিলেই নয়, তাহা এই যে, বাজারে গিয়া উপলব্ধি করিলাম, বাঙ্গালী মর্মে বৈষ্ণব হইলেও, রসনায় শাক্ত । কারণ, পাঁঠার মাংস অগ্নিমূল্য। এতদ্দেশীয় কুক্কুটও তদ্রূপ। হায়, যদি দার্ঢ্যেও শাক্ত হইত ! ইতি ২৩শে ফাল্গুন , ১৪২৯ বঙ্গাব্দ ।

      

Comments

Popular posts from this blog

বিশেষজ্ঞ

দাদার কীর্তি

মাথা